আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদ
মুসলমান হওয়ার প্রথম শর্ত হলো ঈমান গ্রহণ করা। সহীহ ঈমান, আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদ অনুযায়ী বিশ্বাস করার সাথে সম্পর্কিত। আকলের অধিকারী ও বালিগ হওয়ার বয়স হয়েছে এমন প্রত্যেক নর ও নারীর প্রথম কর্তব্য হলো, আহলে সুন্নাহ আলেমদের রচিত কিতাবসমূহ থেকে ঈমানের বিষয়ে শিখা এবং সে অনুযায়ী বিশ্বাস স্থাপন করা। রোজ কিয়ামতের দিবসে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারা আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদ অনুযায়ী বিশ্বাস করার সাথে সম্পর্কিত। শুধুমাত্র আহলে সুন্নাতের অনুসারীরাই জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারবে। এই পথের অনুসারীদেরকে সুন্নীও বলা হয়।
একটি হাদিস শরীফে বর্নিত আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন‘আমার উম্মত তিয়াত্তরটি[৭৩] ফিরকায় (দলে)বিভক্ত হয়ে যাবে। এগুলো র মধ্য থেকে কেবলমাত্র একটি ফিরকা জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে। বাকী সবগুলো ধ্বংসের সম্মুখীন হবে ও জাহান্নামে প্রবেশ করবে’। এই তিয়াত্তরটি ফিরকার সবগুলোই নিজেদেরকে ইসলামের অনুসারী দাবী করে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একমাত্র ফিরকা হিসেবে নিজেদেরকেই বেঁছে নেয়। পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনুন এর ৫৪তম আয়াতে এবং সূরা রূমের ৩২তম আয়াতে তাফসীর আলেমদের প্রদত্ত অর্থানুযায়ী বলা হয়েছে যে ‘প্রত্যেক ফিরকাই নিজেদেরকে সঠিক পথে মনে করে আনন্দিত হবে'। অথচ,এই সমস্ত ফিরকাগুলি থেকে মুক্তিপ্রাপ্তটির আলামত ও ইশারাতসমূহ স্বয়ং পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুক্তিপ্রাপ্ত ফিরকাটি হলো আমার ও সাহাবীদের চলিত পথের অনুসারীদের দল'। এ জন্যই রাসূলের সম্মানিত সাহাবীদের মধ্যে থেকে একজনকেও যে অপছন্দ করল সে আহলে সুন্নাহ থেকে নিজেকে বের করে নিল। আর আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদকে যারা অনুসরণ করে না,তারা হয় কাফির নতুবা (আহলে বিদাআত) পথভ্রষ্ট হয়।
আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদের আলামতসমূহ
মহান আল্লাহ্ তা'আলা, আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদ অনুযায়ী ঈমান গ্রহণকারী মুসলমানের উপর সন্তুষ্ট হোন। এরূপ ঈমান গ্রহণের জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। শর্তগুলি নিম্নে বর্নিত হলো
১. ঈমানের ছয়টি শর্তের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। এগুলো হলো,আল্লাহ্ তায়ালা অস্তিত্ব ও একত্ববাদের উপর এবং তিনি অদ্বিতীয় ও শরিকহীন তা বিশ্বাস করা, ফেরেশতাদের, আসমানী কিতাবসমূহের পয়গম্বরদের ও আখিরাতের জীবনের প্রতি এবং ভাল মন্দ যা কিছু আছে তার সবই আল্লাহর সৃষ্টি তা বিশ্বাস করা। (এই বিষয়গুলি ‘আমানতু বিল্লাহি’ এর মধ্যে আছে।)
২. মহান আল্লাহ্ তায়ালা কর্তৃক নাযিলকৃত সর্বশেষ কিতাব আল কুরআন যে আল্লাহ্ তা'আলার কালাম তা বিশ্বাস করা।
৩. মুমিন ব্যক্তির,নিজের ঈমানের ব্যাপারে কখনই সন্দেহ পোষণ করা ঠিক নয়।
৪. প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসেবে ঈমান এনে, জীবদ্দশায় তার দর্শনের সৌভাগ্য অর্জনকারী সম্মানিত সাহাবীদের প্রত্যেককেই ভালোবাসা উচিত। বিশেষ করে চার খলিফা, রাসূলের নিকটাত্মীয় তথা আহলে বায়েত ও তার (স) সম্মানিত স্ত্রীগণের কারো সম্পর্কে কোন ধরনের কটু কথা বলা উচিত নয়৷
৫. ইবাদতসমূহকে ঈমানের অংশ হিসেবে মনে করা উচিত নয়৷ মহান আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ ও নিষেধকে বিশ্বাস করা স্বত্বেও অলসতার কারণে পালন না করা মুমিনদেরকে কাফির হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়৷ তবে যারা হারামকে গুরুত্বহীন মনে করবে,অবজ্ঞা করবে এবং ইসলামকে নিয়ে উপহাস করবে তাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়।
৬.যারা কা'বাকে কিবলা হিসেবে মেনে নিয়েছে মহান আল্লাহ্ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছে বলে দাবী করে,তারা ভ্রান্ত ই’তিকাদের অনুসারী হলেও তাদেরকে কাফির সাব্যস্ত করা ঠিক নয়।
৭. ইমামের ব্যাপারে প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ করে এমন কিছু জানা না থাকলে তার পিছনে নামাজ আদায় করতে অস্বীকৃতি জানানো উচিত নয়। এই হুকুম, জুমার ও ঈদের নামাজের ইমামতির দ্বায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসক কিংবা সরকারী কর্মকর্তাদের জন্যও প্রযোজ্য।
৮.মুসলমানগণের উচিত তাদের আমীর কিংবা প্রশাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা থেকে বিরত থাকা। কেননা,বিদ্রোহ করার মাধ্যমে সমাজে ফিতনার সৃষ্টি হয় ও বিপর্যয় নেমে আসে। শাসকদের যে সমস্ত ভালোকাজ আছে তার জন্য দোয়া করা উচিত আর অন্যায় ও খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য নাসিহত করা উচিত।
৯. অজু করার সময় পা ধৌত করার বদলে কোন ধরনের উজর কিংবা জারুরাত না থাকা স্বত্বেও ভেজা হাত দিয়ে একবার মাসত্ চামড়ার মোজা এর উপর মাসেহ করা নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই জায়েজ। তবে নগ্ন পা কিংবা মোজার উপরে মাসেহ করা জায়েজ নয়।
১০. মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিরাজ শুধুমাত্র রূহের ক্ষেত্রে নয় বরং রূহের সাথে সাথে শারীরিকভাবেও উর্দ্ধগমন সংঘটিত হয়েছিল। যারা বলে, ‘মিরাজ একধরনের আধ্যাত্মিক অবস্থা, স্বপ্নে হয়েছিল' তারা আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদ থেকে আলাদা হয়ে গেছে।
জান্নাতে মুমিনগণ মহান আল্লাহ্ তায়ালার দর্শন লাভ করবেন। কিয়ামতের দিবসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সালিহবান্দাগণ শাফায়াতের অনুমতি পাবেন। কবরের সওয়াল (প্রশ্ন) বিদ্যমান। রূহ ও শরীর কবরের শাস্তি, ভোগ করবে। আল্লাহর আউলিয়াদের কারামত সত্য। কারামত হলো, মহান আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় বান্দাদের থেকে প্রকাশ পাওয়া অলৌকিক ঘটনা, যা আদাতুল্লাহ অর্থাৎ পদার্থ,রসায়ন,জীববিজ্ঞানের নিয়ম বহির্ভুত এবং মহান আল্লাহ্ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। এত সংখ্যক কারামতের নজীর আছে যে এর অস্তিত্ব অস্বীকারের উপায় নাই। কবরের জগতে রূহেরা,জীবন্ত ব্যক্তিদের কথা ও কাজের ব্যাপারে শুনতে পায়। কুরআন করীমের তিলাওয়াত, সদকা প্রদান, এমনকি সব ধরনের ইবাদতের সওয়াবসমূহ মৃত ব্যক্তিদের রূহকে বখশিশ করা যায় এবং তারা এর দ্বারা উপকৃত হয় এই সওয়াব তাদের আযাব তথা শাস্তি হ্রাস করার কিংবা মাফ করে দেয়ার কারণ হয়। এসব কিছুই আহলে সুন্নাতের ই'তিক্বাদের আলামত হিসেবে বিবেচিত।
