ইবাদত কি
ইবাদতসমূহ ও নামাজ
আমাদের এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতকে শূন্য থেকে অস্তিত্ব দানকারী, দেখা না দেখা সকল ধরণের বিপদ আপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষাকারী, প্রতিটি মূহুর্তে বিভিন্ন রকমের নিয়ামত প্রদানকারী, সকল ধরণের চাহিদার যোগানদানকারী মহান আল্লাহর প্রদত্ত আদেশসমূহ পালন করা ও নিষেধসমূহ থেকে বিরত থাকার নাম ইবাদত। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনকারী পয়গম্বরদের, অলী- আউলিয়াদের,আলেম দের ভক্তি করা,তাদের প্রদর্শিত পন্থায় ইবাদত করা উচিত।
অসংখ্য নিয়ামত প্রেরনকারী মহান আল্লাহর সামর্থ্য অনুযায়ী শুকরিয়া আদায় করা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক কর্তব্য, মানবিক দায়িত্ব। কারণ মানুষ আল্লাহর কাছে চির ঋনী। কিন্তু মানুষ আল্লাহ তা'আলাকে সম্মান জানানোর উপায় ও তার শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যম বা ধরন, কিছুই নিজের ত্রুটিযুক্ত আকিল বিবেক ও ক্ষীন দৃষ্টির দ্বারা অনুসন্ধান করতে সক্ষম নয়। মহান আল্লাহকে কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে হবে,তার শুকরিয়া কিভাবে আদায় করতে হবে তা যদি তিনি মানুষকে না জানাতেন তবে মানুষের উদ্ভাবিত পন্থাগুলো হয়ত তার প্রশংসার পরিবর্তে তাকে অসম্মানের মাধ্যম হত।
আর এজন্যই মহান আল্লাহ তা'আলা তার দেয়া নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের যে ঋনের বোঝা মানুষের কাধে রয়েছে তা মনে প্রানে স্বীকার করে নিয়ে আন্তরিকতার সাথে মৌখিক ও শারীরিকভাবে ইবাদতের মাধ্যমে পরিশোধের পন্থা মানুষকে জানিয়েছেন' একইসাথে তার প্রিয় পয়গম্বরের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করিয়ে দেখিয়েছেন। বান্দা হিসেবে মানুষের কর্তব্য হলো
অর্থাৎ সকল বিবেকবান মানুষের জন্যই মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের ও ইবাদতের ক্ষেত্রে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণকারী ব্যক্তিকে মুসলমান বলা হয়। আর মহান আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় তথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পন্থার অনুসরণ করাকেই ইবাদত বলা হয়। ইসলামিয়্যাতের দুটি অংশ রয়েছে
১. ক্বালবের দ্বারা বিশ্বাস করা। একে ই'তিক্বাদ বলা হয়৷ ৷
২. শরীরের ও ক্বালবের দ্বারা পালনীয় ইবাদতসমূহ।
শরীরের দ্বারা আদায় করা ইবাদতসমূহের মাঝে সর্বোত্তম হলো নামাজ। প্রত্যেক মুকাল্লিফ মুসলমানের উপরে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ তথা অবশ্য পালনীয়।
মুকাল্লিফকে
আকল সম্পন্ন ও বালিগ সকল নর নারীই মুকাল্লিফ হিসেবে বিবেচিত হয়। মুকাল্লিফ ব্যক্তির উপরে মহান আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনের আর নিষেধ থেকে বিরত থাকার দ্বায়িত্ব অর্পিত হয়। শরীয়ত অনুযায়ী মুকাল্লিফ ব্যক্তির উপর প্রথমত ঈমান তথা আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্তবাদের বিশ্বাস এরপর ইবাদতসমূহ পালনের আদেশ রয়েছে একইসাথে হারাম ও মাকরূহ বিষয় ও কাজকর্মের ব্যাপারে নিষেধ রয়েছে।
আকল হলো মানুষের বুঝার ক্ষমতা উপকারী ও ক্ষতিকর বস্তু ও বিষয়ের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আকল একটি পরিমাপক যন্ত্রের মত,যার দ্বারা দুটি উত্তম জিনিষের মাঝের সর্বোত্তমটি এবং দুটি নিকৃষ্ট জিনিষের মাঝের সর্বাধিক নিকৃষ্টটি নির্ণয় করা সম্ভব। শুধুমাত্র ভাল-মন্দ বুঝলেই নয় বরং যে ভাল-মন্দ বুঝার সাথেসাথে ভালটি গ্রহণ করতে আর মন্দটি পরিত্যাগ করতে পারে তাকে আকলসম্পন্ন বা বিবেকবান বলা হয়। আকল হলো চোখের মত আর ইসলামিয়্যাত হলো আলোর মত। আলো না থাকলে চোখ দেখতে পায় না।
বালিগ এর অর্থ হলো বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশকারী। ছেলেদের জন্য তা বার বছর বয়সে শুরু হয়। বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত হওয়ার কিছু আলামত রয়েছে তা প্রকাশ পেলে ঐ ছেলেকে বালিগ বলা হয়। কারও মাঝে যদি বয়ঃসন্ধির আলামত প্রকাশ না পায় এবং বয়স পনের বছর পার হয়ে যায় সেক্ষেত্রে তাকেও শরীয়তের দৃষ্টিতে বালিগ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
মেয়েদের জন্য বয়ঃসন্ধির বয়স নয় বছর থেকে শুরু হয়। এই বয়সের কোন মেয়ের মাঝে বয়ঃসন্ধির আলামত প্রকাশ পেলে তাকে বালিগা বলা হয়। যদি পনের বছরেও এই আলামত প্রকাশ না পায় সেক্ষেত্রে তাকেও শরীয়তের দৃষ্টিতে বালিগা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আফআ’লইমুকাল্লিফিন আহকাম-ই ইসলামিয়্যা
ইসলাম ধর্মের আদেশ ও নিষেধসমূহকে ‘আহকাম-ই শারইয়্যাহ' অথবা ‘আহকাম-ই ইসলামিয়্যাহ' বলা হয়৷ এগুলো কে ‘আফআ’ল-ই মুকাল্লিফিন’ও বলা হয়। এর অর্থ হলো মুকাল্লিফের পালনীয় অথবা বর্জনীয় বিষয়সমূহ। ‘আফআ’ল-ই মুকাল্লিফিন' আটটি। এগুলো হলো ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত,মুস্তাহাব,মুবাহ,হারাম,মাকরূহ এবং মুফসিদ্
১.ফরজ মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে যে সব বিষয় পালনের জন্য স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে আদেশ দিয়েছেন সেগুলোই ফরজ হিসেবে বিবেচিত। ফরজ ত্যাগ করা হারাম। কেউ যদি ফরজকে অস্বীকার করে অথবা দুরুত্বহীন মনে করে তবে সে কাফির হিসেবে পরিগনিত হবে। ফরজ দুই প্রকারের ফরজে আইন প্রত্যেক মুকাল্লিফ মুসলমানের উপর স্বয়ং পালনীয় যে ফরজ রয়েছে তা এর অন্তর্ভূক্ত। ঈমান আনা,অজু করা,পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা,রমজান মাসের রোজা রাখা,নিসাব পরিমান সম্পদ থাকলে যাকাত দেয়া, সামর্থ্য থাকলে হজ্ব পালন করা ইত্যাদি ফরজে আইন। বত্রিশ ফরজ ও চুয়ান্ন ফরজ মশহুর হয়েছে। ফরজে কিফায়া যে সব ফরজ কাজ এক বা একাধিক মুকাল্লিফ মুসলমান ব্যক্তির আদায়ের দ্বারা অন্যরা এর দ্বায়িত্ব পালনের আবশ্যকীয়তা থেকে মুক্তি পায় তাকে ফরজে কিফায়া বলে। মৃত ব্যক্তির গোসল করানো, জানাজার নামাজ আদায় করা,পবিত্র কোরআন করিমের সম্পুর্ণ মুখস্ত করে হাফেজ হওয়া,জিহাদ করা, দ্বীন সংক্রান্ত মাসালা মাসায়েলের সঠিক জওয়াব দিবার মত জ্ঞান অর্জন করা ইত্যাদি ফরজে কিফায়া। এসব ফরজ কেউই যদি আদায় না করে তবে প্রত্যেকেই গুনাহগার হবে।
২.ওয়াজিব যে সব পালনের জন্য ফরজের মতই স্পষ্ট আদেশ রয়েছে কিন্তু ফরজের মত পবিত্র কুরআনের দলিল অকাট্য ও স্পষ্ট নয় তাকে ওয়াজিব বলে। ওয়াজিব জানি দলিল অকাট্য নয় এমন) এর দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। বেতেরের ও দুই ঈদের নামাজ আদায় করা,ধনী হলে কুরবানী করা,ফিতরা দেয়া ইত্যাদি ওয়াজিব। ওয়াজিবও ফরজের মত অবশ্য পালনীয়। ওয়াজিব ত্যাগ করা মারুহে তাহরিমা। ফরজ থেকে পার্থক্য হলো কেউ ওয়াজিবকে অস্বীকার করলে কাফির হয় না। তবে ওয়াজিব পালন না করলেও জাহান্নামের আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।
৩. সুন্নাত যে সব বিষয়ে মহান আল্লাহ পাকের সরাসরি স্পষ্ট আদেশ নাই কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করার জন্য বলেছেন, পালনকারীর প্রশংসা করেছেন অথবা নিজে নিয়মিত পালন করেছেন কিংবা তার উপস্থিতিতে অন্যরা করার পরে মৌন সম্মতি দিয়েছেন সেসব বিষয়কে সুন্নাত বলা হয়। সুন্নাতকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কুফুরী হিসেবে বিবেচিত। তবে যথাযোগ্য সম্মানপূর্বক কেউ যদি সুন্নাত পালনে বিরত থাকে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু বিনা কারণেনিয়মিত যদি সুন্নাত ত্যাগ করে তবে তাকে সতর্ক করা, লজ্জা দেয়া উচিত। সুন্নাত ত্যাগ করলে প্রচুর সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আজান দেয়া,ইকামত দেয়া,জামাতের সাথে নামজ আদায় করা,অজুর সময়ে মিসওয়াক করা,বিয়ের সময় ওয়ালিমা খাওয়ানো, পুত্র সন্তানের খৎনা করানো ইত্যাদি সুন্নাত ইবাদত ।
সুন্নাত দুই প্রকারের হয়
সুন্নাত ই মুয়াক্কাদা যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত পালিত করেছেন এবং খুবই কম সময় ত্যাগ করেছেন এমন শক্তিশালী সুন্নাতকে সুন্নাত ই মুয়াক্কাদা বলে। ফজরের নামাজের সুন্নাত, যোহরের নামাজের পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ মাগরিবের নামাজের সুন্নাত এবং এশার নামাজের পরের দুই রাকাত সুন্নাত মুয়াক্কাদার অন্তর্ভুক্ত। বিনা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা সমীচীন নয়। সুন্নাতকে নিয়ে উপহাস করলে ব্যক্তি কাফিরে পরিনত হয়।
সুন্নাতই গায়রি মুয়াক্কাদা: ইবাদতের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝেমাঝে যে সব আমল করতেন তাকে সুন্নাত ই গায়রি মুয়াক্কাদা বলে। আছর ও এশার নামাজের পূর্বের চার রাকাত সুন্নাতসমুহ গায়রি মুয়াক্কাদা। এগুলো ত্যাগ করলে গুনাহ হয় না কিন্তু কোন ধরণের অপারগতা না থাকা স্বত্বেও নিয়মিত ত্যাগ করলে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হবে। এ ছাড়াও কোন দল থেকে একজনের আদায়ের দ্বারা অন্যদের পক্ষ থেকেও আদায় হয়ে যায় এমন কিছু সুন্নাত রয়েছে। এ গুলোকে ‘সুন্নাত আলাল- কিফায়া’ বলা হয়। যেমন সালাম দেয়া,ই'তিকাফে বসা ইত্যাদি। অজু করা,খাওয়া, পান করা ইত্যাদির মত প্রত্যেক ভাল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা একটি গুরুত্বপুর্ণ সুন্নাত
৪.মুস্তাহাব ইহা মানদুব কিংবা আদব হিসেবেও বিবেচিত। ইহার হুকুম সুন্নাতই গায়রি মুয়াক্কাদার মত। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনে এক.দুইবার করেছেন অথবা পছন্দ করেছেন কিংবা করতে দেখে খুশি হয়েছেন এমন আচরনসমূহ মুস্তাহাবের পর্যায়ে পড়ে। নবজাতক শিশুর জন্য সপ্তম দিনে নাম রাখা, আক্বিকা দেয়া, পরিপাটি পোষাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা ইত্যাদি মুস্তাহাব আমল। এ ধরণের আমল করলে অনেক সওয়াব অর্জিত হয় তবে না করলে গুনাহ হয় না। শাফায়াত থেকেও মাহরূম হতে হয় না।
৫.মুবাহ যে সব বিষয়ে আদেশও দেয়া হয়নি আবার নিষেধও করা হয়নি এমন বিষয়সমূহকে মুবাহ বলে। অর্থাৎ যা করলে গুনাহও হয় না আবার কোন ধরণের আনুগত্যও প্রকাশ পায় না এমন আচরন মুবাহের অন্তর্ভুক্ত। তবে এসব ক্ষেত্রে সৎ নিয়্যাত করলে সওয়াব আর খারাপ নিয়্যাতে করলে গুনাহ হয় ৷ ঘুমানো,হালাল রকমারি খাবার গ্রহণ,হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের দ্বারা বিভিন্ন ধরণের পোষাক পরিধান করা ইত্যাদি মুবাহ। এসব কাজ যদি ইসলামিয়্যাতের অনুসরনের জন্য শরীয়তের আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে করা হয় সেক্ষেত্রে সওয়াব অর্জিত হয়। যেমন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উত্তমভাবে ইবাদত করার নিয়্যাতে পানাহার করা ।
৬. হারাম মহান আল্লাহ তা'আলা সরাসরি পবিত্র কুরআনে যেসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন তা হারাম হিসেবে বিবেচিত। হারাম কাজ করা কিংবা হারাম জিনিষ ব্যবহার করা স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে নিষিদ্ধ। হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করলে ঈমান চলে যায়, কাফিরে পরিনত হতে হয় । হারাম জিনিষ ত্যাগ করা আর হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা ফরজ একইসাথে প্রচুর সওয়াবের কাজ।
হারাম দুই প্রকার
হারাম লি:আইনিহি মানুষ হত্যা করা,জিনা করা,জুয়া খেলা, মদ পান করা, মিথ্যা বলা,চুরি ডাকাতি করা, শুকর রক্ত ও প্রাকৃতিক উপায়ে মৃত পশু খাওয়া, নারীদের সতরের অন্তর্ভুক্তস্থানকে গায়রে মাহরিমদের সামনে প্রদর্শন করা ইত্যাদি হারাম। এসব করলে কবীরা গুনাহ হয়। কেউ যদি এ ধরণের হারাম করার সময়ে বিসমিল্লাহ বলে অথবা হালাল হিসেবে গ্রহণ করে কিংবা আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক হারাম ঘোষনা করার বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করে তবে কাফিরে পরিনত হয়। যদি এ গুলোকে হারাম হিসেবে স্বীকার করে ভীত হয়ে করে তবে কাফির হওয়া থেকে হয়ত নিজেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু এর জন্যে জাহান্নামের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। আর যদি স্বেচ্ছায় বারংবার করে এবং তাওবা না করেই মৃত্যুর সম্মুখীন হয় তবে ঈমানহীন হিসেবে পরিগণিত হবে।
হারাম লি-গায়রিহি যে সব বিষয় বা কাজ নিজে হালাল হওয়া সত্ত্বেও এর দ্বারা অন্যের হক্ব নষ্ট হওয়ায় কিংবা হারামের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় হারাম হিসেবে বিবেচিত হয় সে সব হারাম লিগায়রিহি হিসেবে বিবেচিত। যেমন ফল খাওয়া হালাল কিন্তু অন্যের বাগান থেকে মালিকের অনুমতি না নিয়ে খেলে হারাম হবে। একইভাবে আমানতের খেয়ানত করা,সুদ-ঘুষ খাওয়া,অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করা ইত্যাদিও হারাম। হারাম থেকে বেঁচে থাকার মাঝে ইবাদতের চেয়ে বেশি সওয়াব নিহিত। কেননা হারামের কারণেইবাদতের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়। দুনিয়াতে কেউ অন্যের হক্ব নষ্ট করলে কিয়ামতের দিবসে মহান আল্লাহ তা'আলা তার সওয়াবের দ্বারা যার হক্ব নষ্ট হয়েছে তাকে তার হক্ব বুঝিয়ে দিবেন। সকলেরই উচিত হারাম সম্বন্ধে ভাল করে জেনে তা থেকে বিরত থাকতে স্বচেষ্ট হওয়া।
৭.মাকরূহ, যে সব বিষয় মহান আল্লাহ ও তার প্রিয়নবী অপছন্দ করেন এবং যার কারণেইবাদতের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায় তাকে মাকরূহ বলে।
মাকরূহ দুই প্রকার
মাকরূহই তাহরিমী, যা হারামের কাছাকাছি পর্যায়ে। ওয়াজিব ত্যাগ করাও মাকরূহই তাহরিমী। এর কারণে বান্দাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। সূর্যোদয়ের সময় সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে থাকে তখন এবং সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়াও এরুপ মাকরূহ। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ এসব করলে আল্লাহর অবাধ্য ও পাপী হবে। জাহান্নামের আজাব ভোগ করতে বাধ্য হবে। নামজের ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করলে পুনরায় নামাজ আদায় করতে হয় তবে ভুলে ত্যাগ করলে সাহু সেজদা করতে হয়৷
মাকরূহ-ই তানযিহী যা হালালের কাছাকাছি পর্যায়ের অথবা যা না করা, করার চেয়ে উত্তম এমন ক্রিয়াসমূহ। গাইরে মুয়াক্কাদ সুন্নাত কিংবা মুস্তাহাব ত্যাগ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৮.মুফসিদ্ শরীয়ত অনুযায়ী যার কারণে বৈধ কোন কাজ কিংবা কোন ইবাদত শুরুর পরে তা ভঙ্গ হয়ে যায় কিংবা অবৈধ হয়ে যায় তাকে মুফসিদ্ বলে। যা ঈমান,নামাজ,বিবাহ হজ, যাকাত,ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিকে নষ্ট করে দেয়। যেমন মহান আল্লাহ ও কোরআনকে অসম্মান করলে ঈমান নষ্ট হয়, নামাজের মধ্যে শব্দ করে হাসলে অজু ও নামাজ উভয়ই নষ্ট হয়,রোযা থাকা অবস্থায় পানাহার করলে রোযা নষ্ট হয়৷
ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের পালনকারীকে এবং হারাম ও মাকরুহের ত্যাগকারীকে সওয়াব দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়। অপরদিকে হারাম ও মাকরূহ কাজ করলে এবং ফরজ ও ওয়াজিব ত্যাগ করলে অনেক গুনাহ হয়। একটি হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াব একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াবের চেয়ে অনেক গুন বেশি। একটি ফরজ ইবাদত পালনের সওয়াব একটি মাকরূহ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াবের চেয়ে অনেক গুন বেশি। আবার একটি মাকরূহ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াব একটি সুন্নাত পালনের সওয়াবের চেয়ে অনেক বেশি। আর মুবাহ্ এর মধ্যে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজকে খাইরাত্ ও হাছানাত্ বলা হয়। এগুলো করলেও সওয়াব পাওয়া যায় তবে সুন্নাতের চেয়ে পরিমানে কম হয় ।
ইসলামের শত্রু
ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য আহলে সুন্নাতের কিতাবসমূহের উপর আক্রমন করে। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদাতে বলা হয়েছে যে, ইহুদী ও মুশরিকরা হলো ইসলামে সবচেয়ে বড় শত্রু। মুর্তি পূজারি কাফিরদেরকে মুশরিক বলা হয়। খৃস্টানদের অধিকাংশই যে মুশরিক তা সহজেই বুঝা যায়। ইয়েমেনের আবদুল্লাহ বিন সাবা' নামক ইহুদী আহলে সুন্নাতকে ধ্বংস করার জন্য শিয়া নামক ফিরকার জন্ম দিয়েছে। শিয়াদের অনেকেই আবার নিজেদেরকে আলেভী বলে পরিচয় দেয়। ইসলামের শত্রু ইংরেজরা তাদের সাম্রাজ্যের সর্বশক্তি দিয়ে ভারতবর্ষ এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অর্জিত ধনদৌলত দিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ওহাবী নামে পরিচিত গোষ্ঠীর রচিত কিতাবের মাধ্যমে আহলে সুন্নাতকে আক্রমন করে আসছে। দুনিয়ার সব জায়গা থেকে যেই চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অর্জন করতে চায় তার উচিত শিয়া ও ওহাবী দ্বারা রচিত কিতাবসমূহ দ্বারা প্রতারিত না হয়ে আহলে সুন্নাহ আলেম দের দ্বারা রচিত কিতাবসমূহকে আকড়ে ধরা।
ইসলামের শর্তসমূহ
ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি তথা মুসলমানের জন্য পাঁচটি অবশ্য পালনীয় ফরজ তথা মৌলিক দ্বায়িত্ব রয়েছে।
১. ইসলামের মৌলিক শর্তসমূহের প্রথমটি হলো কালিমা-ই শাহাদাত কে মনে প্রানে স্বীকার করে নেয়া। “আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ” বাক্যটিকে কালিমাই শাহাদাত বলা হয়। এর অর্থ হলো,আসমান ও জমিনে মহান আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কেউই ইবাদত পাওয়ার,উপাসনার উপযোগী নয়। তিনিই একমাত্ৰ মাবুদ,প্রকৃত উপাস্য 'তিনি ওয়াজিবুল উজুদ অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বের জন্য যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন বরং বাকী সবকিছুই তাদের অস্তিত্বের জন্য তার মুখাপেক্ষী এমন আবশ্যকীয় অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি সর্বমহান, সর্বোত্তম বিশেষনে বিশেষিত এবং সকল ধরণের ভুল ত্রুটি থেকে মুক্ত। তিনিই আল্লাহ' এই বিষয়গুলি ক্বালবের দ্বারা বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা। একই সাথে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মিষ্টিভাষী, মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণকারী, হাশেমী বংশীয় আবদুল্লাহ এর সন্তান মুহাম্মাদ আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও রাসূল' আর ওহাবের কন্যা হযরত আমিনা তাঁর মাতা।
২.ইসলামের দ্বিতীয় মৌলিক শর্ত হলো যথাযথ নিয়ম মেনে শর্ত ও ফরজ পালনের দ্বারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পাঁচটি ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা। প্রত্যেক মুসলমানের উপরে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মত আদায় করা ফরজ। নামজ আদায়ের ক্ষেত্রে এর ফরজ ওয়াজিব,সুন্নাতগুলো যত্ন সহকারে মনোযোগ দিয়ে পালন করা এবং নিজেকে সম্পূর্নরূপে আল্লাহর দরবারে সঁপে দেয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে নামাজকে সালাত বলা হয়েছে। সালাতের শাব্দিক অর্থ হলো মানুষের ক্ষেত্রে দোয়া করা,ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রার্থনা করা আর আল্লাহর ক্ষেত্রে এর অর্থ দয়া করা,অনুগ্রহ করা। ইসলামিয়্যাতে সালাত বলতে ফিকহ কিতাবে বর্ণীত নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি ও নির্দিষ্ট দোয়া-দূরুদ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পাঠ করাকে বুঝায়। নামাজ ইফতিতাহ তাক্ববীরের দ্বারা শুরু করতে হয়। পুরুষদের জন্য কানের লতি পর্যন্ত হাত তুলে নাভীর উপরে রাখার সময় আল্লাহু আকবার বলার দ্বারা নামাজ শুরু হয় এবং শেষ বৈঠকে বসে ডান ও বাম কাঁধে মাথা ঘুরিয়ে সালাম দেয়ার মাধ্যমে শেষ হয়৷
৩. ইসলামের তৃতীয় শর্ত হলো,সম্পদের যাকাত প্রদান করা। যাকাত শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো পবিত্রতা অর্জন করা,প্রশংসা করা উত্তম ও সুন্দর হওয়া। ইসলামিয়্যাতে যাকাত বলতে কারো যদি নিসাব পরিমাণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাকাতের উপযুক্ত সম্পদ থাকে, তবে তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদ পবিত্র কুরআনে বর্নিত আট শ্রেণীর লোককে বিনম্রভাবে প্রদান করাকে বুঝায়। চার ধরণের সম্পদের যাকাত দিতে হয়। এগুলো হলো স্বর্ন রৌপ্যের তথা অর্থকড়ির যাকাত বাণিজ্যিক মালের যাকাত বছরের অধিকাংশ সময়ে তৃণভূমি থেকে খেয়ে পালিত হালাল পশুর যাকাত এবং ফসলের যাকাত। ফসলের যাকাতকে উশর ও বলা হয়। জমি থেকে ফসল সংগ্রহের সাথে সাথেই উশর দিতে হয়। অন্য তিন ধরণের মালের যাকাত নিসাব পরিমাণে পৌঁছার এক বছর পরে দিতে হয়।
৪.ইসলামের চতুর্থ শর্ত হলো পবিত্র রমজান মাসের প্রত্যেক দিন রোজা রাখা। রোজা রাখাকে কুরআনের ভাষায় সাওম বলে। সাওমের শাব্দিক অর্থ হলো কোন কিছুকে কোন কিছু থেকে রক্ষা করা,সংরক্ষন করা। ইসলামিয়্যাতে রোজা বলতে রমজান মাসে যথাযথ পন্থায় আল্লাহ তা'আলার আদেশ অনুযায়ী প্রতিদিন তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে সংরক্ষন করা,সংবরণ করাকে বুঝায়। এই তিনটি বিষয় হলো খাওয়া,পান করা ও যৌনমিলন। রমজান মাস আকাশে হিলাল নতুন চাঁদ৷ দেখার মাধ্যমে শুরু হয় এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখার মাধ্যমে শেষ হয় ক্যালেন্ডারে বর্নিত হিসাব অনুযায়ী নয়।
৫.ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির সর্বশেষটি হলো সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপরে জীবনে একবার হজ্ব আদায় করা' যার জন্য পথের নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতা আছে কা’বা শরীফে যেয়ে আসা পর্যন্ত স্ত্রী সন্তান, পরিজনের ভরন পোষনের ব্যবস্থা আছে এবং এগুলো ছাড়াও কা'বা শরীফে যেয়ে আসার মত আর্থিক সামর্থ্য আছে তার উপরে জীবনে একবার ইহরামের সাথে পবিত্র কা’বা তাওয়াফ করা এবং আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ফরজ। উপরে বর্নিত ইসলামের পাঁচটি শর্তের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো কালিমা-ই শাহাদাত বলা ও এর অর্থ মনে প্রানে বিশ্বাস করা। এরপরে নামাজ আদায় করা, তারপর রোজা রাখা, হজ্ব করা এবং সর্বশেষ যাকাত প্রদান করা।
কালিমাই শাহাদাতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত। অন্যান্যগুলির ক্ষেত্রে আলেম দের মাঝে কিছুটা ইখতিলাফ রয়েছে। কালিমাই শাহাদাত ইসলামের শুরুতেই ফরজ হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নবুওয়্যাতের দ্বাদশ বছরে এবং হিজরতের বছর খানেক পূর্বে পবিত্র মি'রাজ রজনীতে ফরজ হয়েছে। রমজানের মাসের রোজা হিজরতের দ্বিতীয় বছরের শা'বান মাসে ফরজ হয়েছে। রোজা যেই বছর ফরজ হয়েছে সেই বছরের রমজান মাসে যাকাত ও ফরজ হয়েছে। আর হজ্ব হিজরতের নবম বছরে ফরজ হয়েছে।
আল্লাহর প্রদর্শিত পথে চলা,তার আদেশ-নিষেধ মানা। উবুদিয়্যাত প্রকাশের জন্য পালনীয় যাবতীয় কর্তব্যের নামই হলো ইসলামিয়্যাত। মহান আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা আদায় শুধুমাত্র তার প্রেরিত পয়গম্বরের প্রদর্শিত পন্থায় করা সম্ভব। পয়গম্বরের প্রদর্শিত পন্থা ব্যাতীত অন্য যে কোনভাবেই শুকরিয়া আদায়ের চেষ্টা করা হোক না কেন তা মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। মহান আল্লাহ তা'আলা তা পছন্দও করেন না। কেননা ইসলামিয়্যাতের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা মানুষের দৃষ্টিতে উত্তম বা মঙ্গলজনক মনে হতে পারে।
অর্থাৎ সকল বিবেকবান মানুষের জন্যই মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের ও ইবাদতের ক্ষেত্রে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পন্থা অবলম্বন করা আবশ্যক।
হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণকারী ব্যক্তিকে মুসলমান বলা হয়। আর মহান আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় তথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পন্থার অনুসরণ করাকেই ইবাদত বলা হয়। ইসলামিয়্যাতের দুটি অংশ রয়েছে
১. ক্বালবের দ্বারা বিশ্বাস করা। একে ই'তিক্বাদ বলা হয়৷ ৷
২. শরীরের ও ক্বালবের দ্বারা পালনীয় ইবাদতসমূহ।
শরীরের দ্বারা আদায় করা ইবাদতসমূহের মাঝে সর্বোত্তম হলো নামাজ। প্রত্যেক মুকাল্লিফ মুসলমানের উপরে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ফরজ তথা অবশ্য পালনীয়।
মুকাল্লিফকে
আকল সম্পন্ন ও বালিগ সকল নর নারীই মুকাল্লিফ হিসেবে বিবেচিত হয়। মুকাল্লিফ ব্যক্তির উপরে মহান আল্লাহ তা'আলার আদেশ পালনের আর নিষেধ থেকে বিরত থাকার দ্বায়িত্ব অর্পিত হয়। শরীয়ত অনুযায়ী মুকাল্লিফ ব্যক্তির উপর প্রথমত ঈমান তথা আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্তবাদের বিশ্বাস এরপর ইবাদতসমূহ পালনের আদেশ রয়েছে একইসাথে হারাম ও মাকরূহ বিষয় ও কাজকর্মের ব্যাপারে নিষেধ রয়েছে।
আকল হলো মানুষের বুঝার ক্ষমতা উপকারী ও ক্ষতিকর বস্তু ও বিষয়ের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আকল একটি পরিমাপক যন্ত্রের মত,যার দ্বারা দুটি উত্তম জিনিষের মাঝের সর্বোত্তমটি এবং দুটি নিকৃষ্ট জিনিষের মাঝের সর্বাধিক নিকৃষ্টটি নির্ণয় করা সম্ভব। শুধুমাত্র ভাল-মন্দ বুঝলেই নয় বরং যে ভাল-মন্দ বুঝার সাথেসাথে ভালটি গ্রহণ করতে আর মন্দটি পরিত্যাগ করতে পারে তাকে আকলসম্পন্ন বা বিবেকবান বলা হয়। আকল হলো চোখের মত আর ইসলামিয়্যাত হলো আলোর মত। আলো না থাকলে চোখ দেখতে পায় না।
বালিগ এর অর্থ হলো বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশকারী। ছেলেদের জন্য তা বার বছর বয়সে শুরু হয়। বয়ঃসন্ধিকালে উপনীত হওয়ার কিছু আলামত রয়েছে তা প্রকাশ পেলে ঐ ছেলেকে বালিগ বলা হয়। কারও মাঝে যদি বয়ঃসন্ধির আলামত প্রকাশ না পায় এবং বয়স পনের বছর পার হয়ে যায় সেক্ষেত্রে তাকেও শরীয়তের দৃষ্টিতে বালিগ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
মেয়েদের জন্য বয়ঃসন্ধির বয়স নয় বছর থেকে শুরু হয়। এই বয়সের কোন মেয়ের মাঝে বয়ঃসন্ধির আলামত প্রকাশ পেলে তাকে বালিগা বলা হয়। যদি পনের বছরেও এই আলামত প্রকাশ না পায় সেক্ষেত্রে তাকেও শরীয়তের দৃষ্টিতে বালিগা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আফআ’লইমুকাল্লিফিন আহকাম-ই ইসলামিয়্যা
ইসলাম ধর্মের আদেশ ও নিষেধসমূহকে ‘আহকাম-ই শারইয়্যাহ' অথবা ‘আহকাম-ই ইসলামিয়্যাহ' বলা হয়৷ এগুলো কে ‘আফআ’ল-ই মুকাল্লিফিন’ও বলা হয়। এর অর্থ হলো মুকাল্লিফের পালনীয় অথবা বর্জনীয় বিষয়সমূহ। ‘আফআ’ল-ই মুকাল্লিফিন' আটটি। এগুলো হলো ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত,মুস্তাহাব,মুবাহ,হারাম,মাকরূহ এবং মুফসিদ্
১.ফরজ মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে যে সব বিষয় পালনের জন্য স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে আদেশ দিয়েছেন সেগুলোই ফরজ হিসেবে বিবেচিত। ফরজ ত্যাগ করা হারাম। কেউ যদি ফরজকে অস্বীকার করে অথবা দুরুত্বহীন মনে করে তবে সে কাফির হিসেবে পরিগনিত হবে। ফরজ দুই প্রকারের ফরজে আইন প্রত্যেক মুকাল্লিফ মুসলমানের উপর স্বয়ং পালনীয় যে ফরজ রয়েছে তা এর অন্তর্ভূক্ত। ঈমান আনা,অজু করা,পবিত্রতা অর্জনের জন্য গোসল করা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা,রমজান মাসের রোজা রাখা,নিসাব পরিমান সম্পদ থাকলে যাকাত দেয়া, সামর্থ্য থাকলে হজ্ব পালন করা ইত্যাদি ফরজে আইন। বত্রিশ ফরজ ও চুয়ান্ন ফরজ মশহুর হয়েছে। ফরজে কিফায়া যে সব ফরজ কাজ এক বা একাধিক মুকাল্লিফ মুসলমান ব্যক্তির আদায়ের দ্বারা অন্যরা এর দ্বায়িত্ব পালনের আবশ্যকীয়তা থেকে মুক্তি পায় তাকে ফরজে কিফায়া বলে। মৃত ব্যক্তির গোসল করানো, জানাজার নামাজ আদায় করা,পবিত্র কোরআন করিমের সম্পুর্ণ মুখস্ত করে হাফেজ হওয়া,জিহাদ করা, দ্বীন সংক্রান্ত মাসালা মাসায়েলের সঠিক জওয়াব দিবার মত জ্ঞান অর্জন করা ইত্যাদি ফরজে কিফায়া। এসব ফরজ কেউই যদি আদায় না করে তবে প্রত্যেকেই গুনাহগার হবে।
২.ওয়াজিব যে সব পালনের জন্য ফরজের মতই স্পষ্ট আদেশ রয়েছে কিন্তু ফরজের মত পবিত্র কুরআনের দলিল অকাট্য ও স্পষ্ট নয় তাকে ওয়াজিব বলে। ওয়াজিব জানি দলিল অকাট্য নয় এমন) এর দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। বেতেরের ও দুই ঈদের নামাজ আদায় করা,ধনী হলে কুরবানী করা,ফিতরা দেয়া ইত্যাদি ওয়াজিব। ওয়াজিবও ফরজের মত অবশ্য পালনীয়। ওয়াজিব ত্যাগ করা মারুহে তাহরিমা। ফরজ থেকে পার্থক্য হলো কেউ ওয়াজিবকে অস্বীকার করলে কাফির হয় না। তবে ওয়াজিব পালন না করলেও জাহান্নামের আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।
৩. সুন্নাত যে সব বিষয়ে মহান আল্লাহ পাকের সরাসরি স্পষ্ট আদেশ নাই কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করার জন্য বলেছেন, পালনকারীর প্রশংসা করেছেন অথবা নিজে নিয়মিত পালন করেছেন কিংবা তার উপস্থিতিতে অন্যরা করার পরে মৌন সম্মতি দিয়েছেন সেসব বিষয়কে সুন্নাত বলা হয়। সুন্নাতকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কুফুরী হিসেবে বিবেচিত। তবে যথাযোগ্য সম্মানপূর্বক কেউ যদি সুন্নাত পালনে বিরত থাকে তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু বিনা কারণেনিয়মিত যদি সুন্নাত ত্যাগ করে তবে তাকে সতর্ক করা, লজ্জা দেয়া উচিত। সুন্নাত ত্যাগ করলে প্রচুর সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আজান দেয়া,ইকামত দেয়া,জামাতের সাথে নামজ আদায় করা,অজুর সময়ে মিসওয়াক করা,বিয়ের সময় ওয়ালিমা খাওয়ানো, পুত্র সন্তানের খৎনা করানো ইত্যাদি সুন্নাত ইবাদত ।
সুন্নাত দুই প্রকারের হয়
সুন্নাত ই মুয়াক্কাদা যা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত পালিত করেছেন এবং খুবই কম সময় ত্যাগ করেছেন এমন শক্তিশালী সুন্নাতকে সুন্নাত ই মুয়াক্কাদা বলে। ফজরের নামাজের সুন্নাত, যোহরের নামাজের পূর্বের ও পরের সুন্নাতসমূহ মাগরিবের নামাজের সুন্নাত এবং এশার নামাজের পরের দুই রাকাত সুন্নাত মুয়াক্কাদার অন্তর্ভুক্ত। বিনা কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করা সমীচীন নয়। সুন্নাতকে নিয়ে উপহাস করলে ব্যক্তি কাফিরে পরিনত হয়।
সুন্নাতই গায়রি মুয়াক্কাদা: ইবাদতের উদ্দেশ্যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাঝেমাঝে যে সব আমল করতেন তাকে সুন্নাত ই গায়রি মুয়াক্কাদা বলে। আছর ও এশার নামাজের পূর্বের চার রাকাত সুন্নাতসমুহ গায়রি মুয়াক্কাদা। এগুলো ত্যাগ করলে গুনাহ হয় না কিন্তু কোন ধরণের অপারগতা না থাকা স্বত্বেও নিয়মিত ত্যাগ করলে মহানবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হবে। এ ছাড়াও কোন দল থেকে একজনের আদায়ের দ্বারা অন্যদের পক্ষ থেকেও আদায় হয়ে যায় এমন কিছু সুন্নাত রয়েছে। এ গুলোকে ‘সুন্নাত আলাল- কিফায়া’ বলা হয়। যেমন সালাম দেয়া,ই'তিকাফে বসা ইত্যাদি। অজু করা,খাওয়া, পান করা ইত্যাদির মত প্রত্যেক ভাল কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা একটি গুরুত্বপুর্ণ সুন্নাত
৪.মুস্তাহাব ইহা মানদুব কিংবা আদব হিসেবেও বিবেচিত। ইহার হুকুম সুন্নাতই গায়রি মুয়াক্কাদার মত। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনে এক.দুইবার করেছেন অথবা পছন্দ করেছেন কিংবা করতে দেখে খুশি হয়েছেন এমন আচরনসমূহ মুস্তাহাবের পর্যায়ে পড়ে। নবজাতক শিশুর জন্য সপ্তম দিনে নাম রাখা, আক্বিকা দেয়া, পরিপাটি পোষাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা ইত্যাদি মুস্তাহাব আমল। এ ধরণের আমল করলে অনেক সওয়াব অর্জিত হয় তবে না করলে গুনাহ হয় না। শাফায়াত থেকেও মাহরূম হতে হয় না।
৫.মুবাহ যে সব বিষয়ে আদেশও দেয়া হয়নি আবার নিষেধও করা হয়নি এমন বিষয়সমূহকে মুবাহ বলে। অর্থাৎ যা করলে গুনাহও হয় না আবার কোন ধরণের আনুগত্যও প্রকাশ পায় না এমন আচরন মুবাহের অন্তর্ভুক্ত। তবে এসব ক্ষেত্রে সৎ নিয়্যাত করলে সওয়াব আর খারাপ নিয়্যাতে করলে গুনাহ হয় ৷ ঘুমানো,হালাল রকমারি খাবার গ্রহণ,হালাল উপায়ে অর্জিত সম্পদের দ্বারা বিভিন্ন ধরণের পোষাক পরিধান করা ইত্যাদি মুবাহ। এসব কাজ যদি ইসলামিয়্যাতের অনুসরনের জন্য শরীয়তের আদেশ পালনের উদ্দেশ্যে করা হয় সেক্ষেত্রে সওয়াব অর্জিত হয়। যেমন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে উত্তমভাবে ইবাদত করার নিয়্যাতে পানাহার করা ।
৬. হারাম মহান আল্লাহ তা'আলা সরাসরি পবিত্র কুরআনে যেসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন তা হারাম হিসেবে বিবেচিত। হারাম কাজ করা কিংবা হারাম জিনিষ ব্যবহার করা স্পষ্ট ও অকাট্যভাবে নিষিদ্ধ। হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম হিসেবে গ্রহণ করলে ঈমান চলে যায়, কাফিরে পরিনত হতে হয় । হারাম জিনিষ ত্যাগ করা আর হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা ফরজ একইসাথে প্রচুর সওয়াবের কাজ।
হারাম দুই প্রকার
হারাম লি:আইনিহি মানুষ হত্যা করা,জিনা করা,জুয়া খেলা, মদ পান করা, মিথ্যা বলা,চুরি ডাকাতি করা, শুকর রক্ত ও প্রাকৃতিক উপায়ে মৃত পশু খাওয়া, নারীদের সতরের অন্তর্ভুক্তস্থানকে গায়রে মাহরিমদের সামনে প্রদর্শন করা ইত্যাদি হারাম। এসব করলে কবীরা গুনাহ হয়। কেউ যদি এ ধরণের হারাম করার সময়ে বিসমিল্লাহ বলে অথবা হালাল হিসেবে গ্রহণ করে কিংবা আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক হারাম ঘোষনা করার বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করে তবে কাফিরে পরিনত হয়। যদি এ গুলোকে হারাম হিসেবে স্বীকার করে ভীত হয়ে করে তবে কাফির হওয়া থেকে হয়ত নিজেকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু এর জন্যে জাহান্নামের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। আর যদি স্বেচ্ছায় বারংবার করে এবং তাওবা না করেই মৃত্যুর সম্মুখীন হয় তবে ঈমানহীন হিসেবে পরিগণিত হবে।
হারাম লি-গায়রিহি যে সব বিষয় বা কাজ নিজে হালাল হওয়া সত্ত্বেও এর দ্বারা অন্যের হক্ব নষ্ট হওয়ায় কিংবা হারামের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় হারাম হিসেবে বিবেচিত হয় সে সব হারাম লিগায়রিহি হিসেবে বিবেচিত। যেমন ফল খাওয়া হালাল কিন্তু অন্যের বাগান থেকে মালিকের অনুমতি না নিয়ে খেলে হারাম হবে। একইভাবে আমানতের খেয়ানত করা,সুদ-ঘুষ খাওয়া,অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করা ইত্যাদিও হারাম। হারাম থেকে বেঁচে থাকার মাঝে ইবাদতের চেয়ে বেশি সওয়াব নিহিত। কেননা হারামের কারণেইবাদতের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়। দুনিয়াতে কেউ অন্যের হক্ব নষ্ট করলে কিয়ামতের দিবসে মহান আল্লাহ তা'আলা তার সওয়াবের দ্বারা যার হক্ব নষ্ট হয়েছে তাকে তার হক্ব বুঝিয়ে দিবেন। সকলেরই উচিত হারাম সম্বন্ধে ভাল করে জেনে তা থেকে বিরত থাকতে স্বচেষ্ট হওয়া।
৭.মাকরূহ, যে সব বিষয় মহান আল্লাহ ও তার প্রিয়নবী অপছন্দ করেন এবং যার কারণেইবাদতের সওয়াব নষ্ট হয়ে যায় তাকে মাকরূহ বলে।
মাকরূহ দুই প্রকার
মাকরূহই তাহরিমী, যা হারামের কাছাকাছি পর্যায়ে। ওয়াজিব ত্যাগ করাও মাকরূহই তাহরিমী। এর কারণে বান্দাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। সূর্যোদয়ের সময় সূর্য যখন ঠিক মাথার উপরে থাকে তখন এবং সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়াও এরুপ মাকরূহ। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ এসব করলে আল্লাহর অবাধ্য ও পাপী হবে। জাহান্নামের আজাব ভোগ করতে বাধ্য হবে। নামজের ওয়াজিবসমূহ ত্যাগ করলে পুনরায় নামাজ আদায় করতে হয় তবে ভুলে ত্যাগ করলে সাহু সেজদা করতে হয়৷
মাকরূহ-ই তানযিহী যা হালালের কাছাকাছি পর্যায়ের অথবা যা না করা, করার চেয়ে উত্তম এমন ক্রিয়াসমূহ। গাইরে মুয়াক্কাদ সুন্নাত কিংবা মুস্তাহাব ত্যাগ করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৮.মুফসিদ্ শরীয়ত অনুযায়ী যার কারণে বৈধ কোন কাজ কিংবা কোন ইবাদত শুরুর পরে তা ভঙ্গ হয়ে যায় কিংবা অবৈধ হয়ে যায় তাকে মুফসিদ্ বলে। যা ঈমান,নামাজ,বিবাহ হজ, যাকাত,ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদিকে নষ্ট করে দেয়। যেমন মহান আল্লাহ ও কোরআনকে অসম্মান করলে ঈমান নষ্ট হয়, নামাজের মধ্যে শব্দ করে হাসলে অজু ও নামাজ উভয়ই নষ্ট হয়,রোযা থাকা অবস্থায় পানাহার করলে রোযা নষ্ট হয়৷
ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাতের পালনকারীকে এবং হারাম ও মাকরুহের ত্যাগকারীকে সওয়াব দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়। অপরদিকে হারাম ও মাকরূহ কাজ করলে এবং ফরজ ও ওয়াজিব ত্যাগ করলে অনেক গুনাহ হয়। একটি হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াব একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াবের চেয়ে অনেক গুন বেশি। একটি ফরজ ইবাদত পালনের সওয়াব একটি মাকরূহ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াবের চেয়ে অনেক গুন বেশি। আবার একটি মাকরূহ থেকে বেঁচে থাকার সওয়াব একটি সুন্নাত পালনের সওয়াবের চেয়ে অনেক বেশি। আর মুবাহ্ এর মধ্যে আল্লাহর পছন্দনীয় কাজকে খাইরাত্ ও হাছানাত্ বলা হয়। এগুলো করলেও সওয়াব পাওয়া যায় তবে সুন্নাতের চেয়ে পরিমানে কম হয় ।
ইসলামের শত্রু
ইসলামের শত্রুরা ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য আহলে সুন্নাতের কিতাবসমূহের উপর আক্রমন করে। পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদাতে বলা হয়েছে যে, ইহুদী ও মুশরিকরা হলো ইসলামে সবচেয়ে বড় শত্রু। মুর্তি পূজারি কাফিরদেরকে মুশরিক বলা হয়। খৃস্টানদের অধিকাংশই যে মুশরিক তা সহজেই বুঝা যায়। ইয়েমেনের আবদুল্লাহ বিন সাবা' নামক ইহুদী আহলে সুন্নাতকে ধ্বংস করার জন্য শিয়া নামক ফিরকার জন্ম দিয়েছে। শিয়াদের অনেকেই আবার নিজেদেরকে আলেভী বলে পরিচয় দেয়। ইসলামের শত্রু ইংরেজরা তাদের সাম্রাজ্যের সর্বশক্তি দিয়ে ভারতবর্ষ এবং আফ্রিকা মহাদেশ থেকে অর্জিত ধনদৌলত দিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এবং ওহাবী নামে পরিচিত গোষ্ঠীর রচিত কিতাবের মাধ্যমে আহলে সুন্নাতকে আক্রমন করে আসছে। দুনিয়ার সব জায়গা থেকে যেই চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অর্জন করতে চায় তার উচিত শিয়া ও ওহাবী দ্বারা রচিত কিতাবসমূহ দ্বারা প্রতারিত না হয়ে আহলে সুন্নাহ আলেম দের দ্বারা রচিত কিতাবসমূহকে আকড়ে ধরা।
ইসলামের শর্তসমূহ
ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তি তথা মুসলমানের জন্য পাঁচটি অবশ্য পালনীয় ফরজ তথা মৌলিক দ্বায়িত্ব রয়েছে।
১. ইসলামের মৌলিক শর্তসমূহের প্রথমটি হলো কালিমা-ই শাহাদাত কে মনে প্রানে স্বীকার করে নেয়া। “আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ” বাক্যটিকে কালিমাই শাহাদাত বলা হয়। এর অর্থ হলো,আসমান ও জমিনে মহান আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কেউই ইবাদত পাওয়ার,উপাসনার উপযোগী নয়। তিনিই একমাত্ৰ মাবুদ,প্রকৃত উপাস্য 'তিনি ওয়াজিবুল উজুদ অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বের জন্য যিনি কারো মুখাপেক্ষী নন বরং বাকী সবকিছুই তাদের অস্তিত্বের জন্য তার মুখাপেক্ষী এমন আবশ্যকীয় অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি সর্বমহান, সর্বোত্তম বিশেষনে বিশেষিত এবং সকল ধরণের ভুল ত্রুটি থেকে মুক্ত। তিনিই আল্লাহ' এই বিষয়গুলি ক্বালবের দ্বারা বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা। একই সাথে উত্তম চরিত্রের অধিকারী, মিষ্টিভাষী, মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণকারী, হাশেমী বংশীয় আবদুল্লাহ এর সন্তান মুহাম্মাদ আলাইহিস্ সালাম আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও রাসূল' আর ওহাবের কন্যা হযরত আমিনা তাঁর মাতা।
২.ইসলামের দ্বিতীয় মৌলিক শর্ত হলো যথাযথ নিয়ম মেনে শর্ত ও ফরজ পালনের দ্বারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট পাঁচটি ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা। প্রত্যেক মুসলমানের উপরে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মত আদায় করা ফরজ। নামজ আদায়ের ক্ষেত্রে এর ফরজ ওয়াজিব,সুন্নাতগুলো যত্ন সহকারে মনোযোগ দিয়ে পালন করা এবং নিজেকে সম্পূর্নরূপে আল্লাহর দরবারে সঁপে দেয়া উচিত। পবিত্র কুরআনে নামাজকে সালাত বলা হয়েছে। সালাতের শাব্দিক অর্থ হলো মানুষের ক্ষেত্রে দোয়া করা,ফেরেশতাদের ক্ষেত্রে ক্ষমা প্রার্থনা করা আর আল্লাহর ক্ষেত্রে এর অর্থ দয়া করা,অনুগ্রহ করা। ইসলামিয়্যাতে সালাত বলতে ফিকহ কিতাবে বর্ণীত নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গি ও নির্দিষ্ট দোয়া-দূরুদ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পাঠ করাকে বুঝায়। নামাজ ইফতিতাহ তাক্ববীরের দ্বারা শুরু করতে হয়। পুরুষদের জন্য কানের লতি পর্যন্ত হাত তুলে নাভীর উপরে রাখার সময় আল্লাহু আকবার বলার দ্বারা নামাজ শুরু হয় এবং শেষ বৈঠকে বসে ডান ও বাম কাঁধে মাথা ঘুরিয়ে সালাম দেয়ার মাধ্যমে শেষ হয়৷
৩. ইসলামের তৃতীয় শর্ত হলো,সম্পদের যাকাত প্রদান করা। যাকাত শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো পবিত্রতা অর্জন করা,প্রশংসা করা উত্তম ও সুন্দর হওয়া। ইসলামিয়্যাতে যাকাত বলতে কারো যদি নিসাব পরিমাণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যাকাতের উপযুক্ত সম্পদ থাকে, তবে তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদ পবিত্র কুরআনে বর্নিত আট শ্রেণীর লোককে বিনম্রভাবে প্রদান করাকে বুঝায়। চার ধরণের সম্পদের যাকাত দিতে হয়। এগুলো হলো স্বর্ন রৌপ্যের তথা অর্থকড়ির যাকাত বাণিজ্যিক মালের যাকাত বছরের অধিকাংশ সময়ে তৃণভূমি থেকে খেয়ে পালিত হালাল পশুর যাকাত এবং ফসলের যাকাত। ফসলের যাকাতকে উশর ও বলা হয়। জমি থেকে ফসল সংগ্রহের সাথে সাথেই উশর দিতে হয়। অন্য তিন ধরণের মালের যাকাত নিসাব পরিমাণে পৌঁছার এক বছর পরে দিতে হয়।
৪.ইসলামের চতুর্থ শর্ত হলো পবিত্র রমজান মাসের প্রত্যেক দিন রোজা রাখা। রোজা রাখাকে কুরআনের ভাষায় সাওম বলে। সাওমের শাব্দিক অর্থ হলো কোন কিছুকে কোন কিছু থেকে রক্ষা করা,সংরক্ষন করা। ইসলামিয়্যাতে রোজা বলতে রমজান মাসে যথাযথ পন্থায় আল্লাহ তা'আলার আদেশ অনুযায়ী প্রতিদিন তিনটি বিষয় থেকে নিজেকে সংরক্ষন করা,সংবরণ করাকে বুঝায়। এই তিনটি বিষয় হলো খাওয়া,পান করা ও যৌনমিলন। রমজান মাস আকাশে হিলাল নতুন চাঁদ৷ দেখার মাধ্যমে শুরু হয় এবং শাওয়ালের চাঁদ দেখার মাধ্যমে শেষ হয় ক্যালেন্ডারে বর্নিত হিসাব অনুযায়ী নয়।
৫.ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির সর্বশেষটি হলো সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপরে জীবনে একবার হজ্ব আদায় করা' যার জন্য পথের নিরাপত্তা ও শারীরিক সুস্থতা আছে কা’বা শরীফে যেয়ে আসা পর্যন্ত স্ত্রী সন্তান, পরিজনের ভরন পোষনের ব্যবস্থা আছে এবং এগুলো ছাড়াও কা'বা শরীফে যেয়ে আসার মত আর্থিক সামর্থ্য আছে তার উপরে জীবনে একবার ইহরামের সাথে পবিত্র কা’বা তাওয়াফ করা এবং আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ফরজ। উপরে বর্নিত ইসলামের পাঁচটি শর্তের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো কালিমা-ই শাহাদাত বলা ও এর অর্থ মনে প্রানে বিশ্বাস করা। এরপরে নামাজ আদায় করা, তারপর রোজা রাখা, হজ্ব করা এবং সর্বশেষ যাকাত প্রদান করা।
কালিমাই শাহাদাতের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত। অন্যান্যগুলির ক্ষেত্রে আলেম দের মাঝে কিছুটা ইখতিলাফ রয়েছে। কালিমাই শাহাদাত ইসলামের শুরুতেই ফরজ হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নবুওয়্যাতের দ্বাদশ বছরে এবং হিজরতের বছর খানেক পূর্বে পবিত্র মি'রাজ রজনীতে ফরজ হয়েছে। রমজানের মাসের রোজা হিজরতের দ্বিতীয় বছরের শা'বান মাসে ফরজ হয়েছে। রোজা যেই বছর ফরজ হয়েছে সেই বছরের রমজান মাসে যাকাত ও ফরজ হয়েছে। আর হজ্ব হিজরতের নবম বছরে ফরজ হয়েছে।
