মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি
মৃত্যুকে স্মরণ করা সবচেয়ে বড় উপদেশ। প্রত্যেক বিশ্বাসীদের জন্য মৃত্যুকে স্মরণ করা সুন্নাত। এটি বিধি নিষেধ মেনে চলতে এবং পাপ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। এটি মানুষকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে রাখে। আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মাঝে মাঝে মৃত্যুকে স্মরণ করো, এটি আমোদ প্রমোদ থেকে দূরে রাখে!” তাসাউফের কিছু মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুকে স্মরণ করা অভ্যাসে পরিণত করেছিলেন। মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন বুখারি নিজেকে মৃত মনে করতেন এবং দিনে বিশবার নিজেকে প্রোথিত মনে করতেন।
পৃথিবীর মোহের কারণে মানুষ অনেকদিন বাঁচতে চায়। ইবাদাতের এবং ইসলামের খেদমতের জন্য বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা দুনিয়াবি মোহ নয়। যাদের এই মোহ রয়েছে তারা নির্ধারিত সময়ে ইবাদাত করবে না। তারা তাওবা করবে না পাপ থেকে বাঁচার জন্য, পুনরায় পাপ না করার জন্য, কিংবা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য। তাদের হৃদয় অভেদ্য। তারা মৃত্যুকে স্মরণ করে না। উৎসাহ এবং উপদেশ তাদের কোন কাজেই আসবে না৷
যে বাক্তি শুধু পৃথিবীর চিন্তা করে সে শুধুমাত্র পদ এবং মর্যাদার পেছনে দৌড়ায় এবং সেগুলো অর্জনের জন্য পুরো জীবন কাজ করে যায়। সে তার পদ মর্যাদা এবং প্রাচুর্যের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে এবং পরবর্তী জীবনের কথা এক হাদিসে বলা হয়েছে:
( মৃত্যুর আগে মর। নিজের হিসেব নিজে নাও, তোমার হিসেব নেয়ার আগে) ) (আপনি যা জানেন প্রানিরা তা যদি জানতো মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে, আপনি কোন প্রানিকে ভালোভাবে প্রতিপালিত করতে পারতেন না।) (যিনি নিয়মিত মৃত্যুকে স্মরণ করেন, সকাল সন্ধ্যা, তারা কিয়ামাতের দিন শহীদদের সাথে থাকবেন।)
পৃথিবীর মোহ সমূহ হচ্ছে, ভালোবাসা এবং প্রমোদে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা, মৃত্যুর চিন্তা থেকে দূরে থাকা, নিজের অল্প স্থায়ী তারুণ্য এবং শরীরে বিশ্বাস করা। এই সকল কারণ থেকে আমাদের দূরে থাকা উচিত পৃথিবীর মোহ থেকে বাঁচার জন্য।
সকলের জানা উচিত এই সকল মোহের ভয়াবহতা এবং মৃত্যুকে স্মরণ করার সুফল। হাদিস শারিফে বলা হয়েছে: মাঝে মাঝে মৃত্যুকে স্মরণ করো। মৃত্যুকে স্মরণ করা আপনাকে পাপ থেকে দূরে রাখবে এবং খারাপ কাজ থেকে দূরে রেখে মৃত্যুর পরের আজাব থেকে রক্ষা করে।
মৃত্যু কি?
মৃত্যু মানেই সব কিছুর শেষ নয়। মৃত্যু হচ্ছে শরীর থেকে আত্মার বিচ্ছেদ। এটির মাধ্যমে শরীর থেকে আত্মা আলাদা হয়ে যায়। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ এক জগত থেকে অন্য জগতে যায়। এটি এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি তে যাওয়ার মত। উমার ইবনে আব্দুল আজিজ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, তোমাকে অনন্তকালের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তুমি শুধু এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ভ্রমন করবে!” মৃত্যু বিশ্বাসীদের জন্য রহমত এবং পুরস্কার স্বরূপ। পাপীদের জন্য এটি শাস্তি স্বরূপ। মানুষ মৃত্যু চায় না। যদিও অপকর্মের চেয়ে মৃত্যুর উপকার বেশি। মানুষ বাঁচতে চায়। যদিও মৃত্যু তার জন্য উপকারী। সত্য বিশ্বাসীরা মৃত্যুর মাধ্যমে মুক্তি পায় পৃথিবীর পরিশ্রম এবং যন্ত্রণা থেকে। নিষ্ঠুরের মৃত্যুর মাধ্যমে দেশ এবং জাতি মুক্তি পায়। একটি পুরাতন কবিতা রয়েছে, নিষ্ঠুর কোন বাক্তির মৃত্যুতে লেখা :
না সে সুখে থাকলো, না তার সাথের মানুষেরা সুখ পেল। অবশেষে তার সমাপ্তি ঘটেছে, শান্ত হও, হ্যাঁ তুমি, তার সাথে থাকবে!
কোন ইমানদারের শরীর থেকে আত্মা বের হওয়া মানে সে যেন বন্দিশালা থেকে মুক্তি পেল। এক সময় মৃত মুমিন ব্যক্তি পুনরায় পৃথিবীতে ফিরতে চায় না। একজন শাহীদ পুনরায় ফিরতে চান আবার শহীদ হওয়ার জন্য। মৃত্যু প্রত্যেক মুসলিমের জন্য পুরুস্কার সরূপ। একজন বাক্তির বিশ্বাস কেবল মাত্র তার কবরের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়। কবরের জীবন হয় জান্নাতের বাগান অথবা নরকের অংশবিশেষ।
মৃত্যু অপরিহার্য
মৃত্যু থেকে বাঁচা কি সম্ভব? অবশ্যই না। কেউ নিজের ইচ্ছামত এক সেকেন্ড বাঁচতে পারে না। মৃত্যুর জন্য নির্ধারিত সময়ে সে মারা যাবে। এই মুহূর্তটি কিছুটা চখের পলক পড়ার সমান। কুরআনে কারিমের একটি আয়াতে বলা হয়েছে: (যখন মৃত্যুর সময় হয়, তারা এটিকে এক ঘণ্টা পেছাতে বা আগাতে পারে না।) আল্লাহ তায়ালা কোন বাক্তির যেখানে মৃত্যু নির্ধারিত রেখেছেন সেখানেই তার মৃত্যু হবে, সকল সম্পদ এবং সন্তান রেখে যাবেন। আল্লাহ তায়ালা জানেন ঠিক কতবার আমরা দিনে নিঃশ্বাস নেই। এমন কিছু নেই যা তিনি জানেন না। আমাদের জীবন যদি ইবাদাত এবং বিশ্বাসের মাঝে অতিবাহিত হয় তবে, তার শেষ রহমতের হবে। আজরাইল আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা'য়ালা নির্দেশ দিয়েছেন: ( আমার প্রিয় বান্দাদের জান সহজে কবজ করো আর আমার অপ্রিয় দের আজাবের সাথে কবজ করো!) মুমিনদের জন্য এটি শুভ সংবাদ। যারা ইমান থেকে দূরে থাকে তাদের জন্য এটি দুঃখের সংবাদ।
জানাজার নামাজ
কোন মুমিন যখন মৃত্যু বরণ করে তখন এ সংবাদ যারা শুনতে পায় সেসকল পুরুষের উপরে পুরুষ না থাকলে নারীদের উপরে তার জন্য জানাজা নামাজ আদায় করা ফরজই কিফায়া হয়। জানাজার নামাজ,আল্লাহ্র জন্য নামাজ আর মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া স্বরূপ। এই নামাজকে গুরুত্ব না দিলে ঈমান লোপ পায়।
জানাজার নামাজের শর্তসমূহ
১.মৃত ব্যক্তির মুসলমান হতে হবে।
২. মুর্দাকে গোসল করিয়ে নিতে হবে। গোসল না করিয়েই কবরে শায়িত করলে ও উপরে মাটি দিয়ে ঢেকে না দিলে সেখান থেকে তুলে গোসল করিয়ে তারপর জানাজার নামাজ আদায় করতে হবে। যেখানে জানাজা রাখা হবে ও যেখানে ইমাম দাঁড়াবেন সেসব স্থানের পবিত্র হওয়া আবশ্যক।
৩. মুর্দার পুরো শরীর না থাকলে অর্ধেকের বেশী দেহ কিংবা মাথার বা মাথাবিহীন অর্ধেকের চেয়ে বেশী পরিমাণ দেহ ইমামের সামনে উপস্থিত রাখা আবশ্যক।
৪. মুর্দাকে মাটিতে অথবা মাটির নিকটে হাতে ধরে কিংবা পাথরের উপরের রাখা উচিত। মুর্দার মাথা ইমামের ডান দিকে আর পা ইমামের বাম দিকে রাখতে হবে। এর উল্টো করে রাখলে গুনাহ হবে।
৫.জানাজা ইমামের সামনে উপস্থিত রাখতে হবে।
৬. মুর্দার ও ইমামের সতর ঢাকা থাকতে হবে।
জানাজার নামাজের ফরজসমূহ
১.চারবার তাকবীর দেয়া
২. দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করা।
জানাজার নামাজের সুন্নাতসমূহ
১.‘সুবহানাকা’ পাঠ করা।
২. দুরুদ শরীফ পাঠ করা।
৩. নিজের মৃত ব্যক্তির ও সমস্ত মুসলমানদের ক্ষমা ও মাগফেরাতের উল্লেখ আছে এমন দোয়া পাঠ করা।
জানাজার নামাজ মসজিদের ভিতরে আদায় করা যায় না। শিশু জীবিত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে মারা গেলে তার নাম রাখতে হবে। পরে গোসল করিয়ে কাফন পরিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করতে হবে।
জানাজা বহনের সময়, খাটিয়ার চার কোণাকে ধরতে হয়। প্রথমে জানাজার মাথার দিক ডান কাঁধে পরে পায়ের দিক ডান কাঁধে এরপর মাথার দিক বাম কাঁধে ও পায়ের দিক বাম কাঁধে রেখে প্রত্যেকে দশ কদম বহন করবে ও এভাবে পরিবর্তন করে কবর পর্যন্ত চলবে। কবরে পৌঁছার পরে লাশ জমিনে না রাখা পর্যন্ত কেউ বসবে না। দাফনের সময় যাদের কাজ থাকবে না তারা বসতে পারবে। জানাজার নামাজ আদায়ের পদ্ধতি জানাজার নামাজ চার তাকবীরের দ্বারা আদায় কোয়া হয়। এর প্রত্যেক তাকবীর এক রাকাতের ন্যায়। চার তাকবীরের মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম তাকবীরের সময় কান পর্যন্ত হাত তুলতে হয়। পরবর্তী তিন তাকবীরের সময় হাত তুলতে হয় না।
১. প্রথম তাকবীরের পরে হাত বেঁধে ‘সুবহানাকা’ পাঠ করতে হয় ও এর সাথে ‘ওয়া যাল্লা ছানাউকা’ যোগ করতে হয়। এর সাথে সূরা ফাতিহা পাঠ করা যায না।
২. দ্বিতীয় তাকবীরের পরে নামাজের শেষ বৈঠকে যে দুরুদ পড়া হয় তা পড়তে হয়। একে দুরুদে ইবরাহীম বলা হয়। অর্থাৎ, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি’ ও ‘বারিক’ এই দুরুদটি পাঠ করতে হয়।
৩ তৃতীয় তাকবীরের পরে জানাজার দোয়া পড়তে হয়। জানাজার দোয়ার বদলে ‘রব্বানা আতিনা’ অথবা শুধু ‘আল্লাহুম্মাগফিরলাহ' বললে কিংবা দোয়ার নিয়্যাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করলেও হবে।)
৪.চতুর্থ তাকবীরের পরে সাথে সাথে ডানে বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়। সালাম ফিরানোর সময় মুর্দার ও জামাতের প্রতি নিয়্যাত করতে হয়। ইমাম শুধুমাত্র চার তাকবীর ও দুই দিকে দেয়া সালামকে উঁচুস্বরে বলবে, বাকী সবকিছু নিচুস্বরে বলবে।
