অসুস্থ অবস্থায় নামাজ
যে সব কারণে অজু ভঙ্গ হয় তা যদি বিরামহীনভাবে কারো মাঝে প্রকাশিত হতে থাকে তবে তা শরীয়ত অনুযায়ী উজর (যুক্তি সঙ্গত কারণ হিসেবে বিবেচিত হবে। কারো যদি কোণ নামাজের ওয়াক্তের পুরো সময় ধরে বিরামহীনভাবে প্রস্রাব বের হয়, পিছনের রাস্তা দিয়ে বায়ু নির্গমন হয়,নাক দিয়ে রক্ত ঝরে,চোখে ব্যাথা থাকায় পানি পরে শরীরের কোন ক্ষত থেকে রক্ত বের হয় কিংবা ফোঁড়া থেকে পুঁজ বের হয় তবে সে উজরওয়ালা ব্যাক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। যে সব মহিলার ইস্তিহাজার রক্ত বের হতে থাকে সেও উজরওয়ালা হিসেবে বিবেচিত হয়। যে সব কারণে অজু ভঙ্গ হয় তা থেকে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। যেমন, ওষুধ ব্যাবহার করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে, প্যাড ব্যবহারের মাধ্যমে অথবা বসে কিংবা ইশারায় নামাজ আদায়ের মাধ্যমে ঐ অবস্থা থেকে সাময়িকভাবে পরিত্রান পেতে পারে। যে সমস্ত পুরুষের প্রস্রাব অল্প অল্প করে অবিরাম ঝরতে থাকে তারা প্রস্রাবের রাস্তা তুলা,টিস্যু জাতীয় কোন কিছু দিয়ে বন্ধ করে দ্রুত অজু করে নামাজ আদায় করবে। পরে তা খুলে ফেলবে। তুলা বা টিস্যু ভিজে প্রস্রাব বাইরে না আসা পর্যন্ত অজু ভঙ্গ হয় না তাই উজর থেকে মুক্তি পাবে। তবে যদি কিছুটা বেশী পরিমাণে বের হয় যা তুলা বা টিস্যু ভিজিয়ে বাইরে চলে আসে তবে অজু ভেঙ্গে যাবে। খেয়াল রাখা উচিত প্রস্রাব যেন পোশাকে লেগে নাপাক করে না দেয়। কোন উপায়েই যারা উজর থেকে মুক্তি পেতে পারে না তারা প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তের জন্য নতুন করে অজু করে তারপর নামাজ আদায় করবে। উজরওয়ালা ব্যাক্তিরা এক অজু দিয়ে ঐ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ফরজ,ক্বাযাসহ যত খুশি নফল নামাজ আদায় করতে পারবে কুরআন করীম তিলাওয়াত করতে পারবে। তবে ঐ ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তার অজু ভেঙ্গে যাবে। নতুন করে নতুন ওয়াক্তের জন্য অজু করে নিতে হবে। যেই ওয়াক্তে অজু করা হয় সেই ওয়াক্তেও যদি উজরের কারণ ব্যাতীত অজু ভঙ্গের অন্য কোন কারণ প্রকাশ পায় সেক্ষেত্রেও উজরওয়ালার অজু ভঙ্গ হয়। যেমন কারো নাকের এক পাশ থেকে অবিরাম রক্ত ঝরার কারণে উজরওয়ালা বিবেচিত হওয়ায় অজু করার পর নাকের ঐ ফুটা দিয়ে রক্ত ঝরা সত্ত্বেও তার অজু ভেঙ্গে যায় না। কিন্তু যদি নাকের অন্য পাশ দিয়ে সামান্য রক্তও ঝরে সাথেসাথেই তার অজু ভঙ্গ হয়ে যাবে।
উজরওয়ালা বিবেচিত হওয়ার জন্য যে সব কারণে অজু ভঙ্গ হয় তা এক নামাজ ওয়াক্তের পুরো সময় জুড়ে সংঘটিত হতে হয়। যদি অজু করে ওয়াক্তের ফরজ নামাজটুকু আদায় করার মত সময় অজু ভঙ্গের কারণ বন্ধ থাকে তবে ব্যাক্তি উজরওয়ালা বিবেচিত হবে না। ইমাম মালিকের একটি মত অনুযায়ী এক ফোটা প্রবাহিত হলেও উজরওয়ালা বিবেচিত হবে। উজরওয়ালা কোন ব্যাক্তির উজর যদি পরবর্তী ওয়াক্তে একবারের জন্যও প্রকাশ পায়, এক ফোঁটাও যদি প্রবাহিত হয় তবে সেই ওয়াক্তের জন্যও সে উজরওয়ালা বিবেচিত হবে। যদি পরবর্তী কোন ওয়াক্তে একবারের জন্যও উজর প্রকাশ না পায় তবে ব্যক্তি আর উজরওয়ালা বিবেচিত হবে না। উজরের কারণে যদি পোশাকে এক দিরহাম পরিমানের চেয়ে অতিরিক্ত নাজাসাত লাগে এবং পুনরায় নাজাসাত লাগা থেকে পোশাককে রক্ষা করা সম্ভব হলে, যে স্থানে নাপাকী লেগেছে তা ধুয়ে ফেলা আবশ্যক।
ফরজ গোসল আদায় করলে যদি রোগাক্রান্ত হওয়ার কিংবা রোগের তীব্রতা বৃদ্ধির অথবা রোগ থেকে মুক্তি পেতে বিলম্ব হওয়ার আশংকা থাকে তবে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করতে হয়। এই আশংকা যথার্থই কিনা তা ব্যাক্তির অতীত অভিজ্ঞতা থেকে কিংবা সৎ মুসলমান চিকিৎসকের পরামর্শ থেকে প্রতীয়মান হবে। অমুসলিম কিন্তু সৎ ও পেশাদার চিকিৎসকের মতামত অনুযায়ীও আশংকার যথার্থতা সাব্যস্ত হয়। আবহাওয়া অতিরিক্ত ঠাণ্ডা হলে,তীব্র শীতের সময়ে গোসলের পানি গরম করার ব্যাবস্থা না থাকায় ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে অসুস্থ হওয়ার আশংকা থাকে। হানাফী মাজহাব অনুযায়ী এক তায়াম্মুম দিয়ে যত ইচ্ছা তত ফরজ নামাজ আদায় করা সম্ভব যদি তায়াম্মুম ভঙ্গ না হয়। কিন্তু শাফী ও মালিকী মাজহাব অনুযায়ী প্রত্যেক ফরজ নামাজের জন্য নতুন করে তায়াম্মুম করতে হয় ।
অজুতে যেসব অঙ্গ ধৌত করতে হয় তার অর্ধেকে যদি ক্ষত থাকে তবে তায়াম্মুম করতে হয়। যদি ক্ষত অর্ধেকের কম অঙ্গে থাকে তবে সুস্থ অঙ্গসমূহ ধৌত করে ক্ষতস্থানে মাসেহ করতে হবে। ফরজ গোসলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ন শরীর একটি অঙ্গ হিসেবে বিবাচিত হওয়ায় শরীরের অর্ধেক বা তার বেশী স্থানে ক্ষত থাকলে তায়াম্মুম করতে হয়। ক্ষতের পরিমাণ শরীরের অর্ধেকের চেয়ে কম হলে, সুস্থ অংশ ধৌত করে ক্ষতস্থানে মাসেহ করতে হয়। ক্ষতস্থানে মাসেহ করাতে ক্ষতির আশংকা থাকলে ব্যান্ডেজের উপর দিয়ে মাসেহ করতে হবে। তাতেও ক্ষতির আশংকা থাকলে মাসেহ করা থেকে বিরত থাকবে। অজু ও গোসলের সময়ে মাথা মাসেহ করতে গিয়া ক্ষতির আশংকা থাকলে মাসেহ করতে হবে না। কারো হাতে ক্ষত থাকার কারণে পানি ব্যাবহারে অক্ষম হলে তায়াম্মুম করবে। এরজন্য তার মুখমণ্ডল ও দুহাতকে দেয়ালে, পাথরে কিংবা মাটি জাতীয় কোন কিছুতে ঘষে তায়াম্মুম করে নিবে। কারো যদি হাত পা কাটা থাকে আর মুখমণ্ডলে ক্ষত থাকে তবে সে অজুবিহীন অবস্থাতেই নামাজ আদায় করবে।
কোন ব্যাক্তি নিজে নিজে অজু করতে অপারগ হলে এবং তাকে অজু করিয়ে দেয়ার মত কাউকে খুজে না পেলে তায়াম্মুম করবে। তার নিজের সন্তান, দাস কিংবা অর্থের বিনিময়ে সেবাদানকারী ব্যাক্তি তাকে অজু করার জন্য সাহায্যের হাত বারিয়ে দিতে বাধ্য। এদের কাউকে না পেলে অন্যদের নিকট সাহায্য চাইবে। তবে অন্য কেউ তাকে সাহায্য করতে বাধ্য নয়। এমনকি স্বামী- স্ত্রীও একে অপরকে অজুর ব্যাপারে সাহায্য করতে বাধ্য নয়।
যাদের শরীরে ক্ষতের জন্য ব্যাণ্ডেজ আছে কিংবা হাড্ডিতে ভাঙ্গন অথবা চিড় ধরার কারণে প্লাস্টার করা হয়েছে তারা অজু গোসলের সময় যখন তা পানি দিয়ে ধৌত করতে অপারগ হবে তখন তার উপরে মাসেহ করে নিবে। যদি পুরো অংশে মাসেহ করতে অপারগ হয় তবে এর অর্ধেকের চেয়ে বেশী অংশে একবার মাসেহ করবে। ব্যান্ডেজ খুললে ক্ষতির আশংকা থাকলে এর নিচে থাকা সুস্থ চামড়া ধৌত করতে হবে না। তবে ব্যান্ডেজের ফাঁক দিয়ে যতটুকু ভাল চামড়া দেখা যায় সেখানে মাসেহ করে নিতে হবে। অজু অবস্থায় ব্যান্ডেজ বাঁধতে হবে এমন কোন শর্ত নাই। মাসেহ করার পর ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করে আরেকটি লাগানো হলে নতুনটির উপরে পুনরায় মাসেহ করার প্রয়োজন নাই।
কারো যদি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করার কারণে রোগ বৃদ্ধির আশংকা থাকে কিংবা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ে অক্ষম হলে,বসে নামাজ আদায় করবে। রুকুর জন্য শরীরকে সামান্য সামনের দিকে ঝুকাবে অতঃপর সোজা হবে। সেজদা স্বাভাবিক নিয়মেই আদায় করবে। আর যেভাবে বসলে সুবিধা হয় সেভাবেই বসবে। হাটু ভেঙ্গে,পা বিছিয়ে কিংবা পাছার উপরেও বসতে পারে। মাথা ব্যাথা,দাঁত ব্যাথা,হাটু ব্যাথা,চোখের ব্যাথা ইত্যাদি সবই রোগ হিসেবে গণ্য হবে। শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আশংকাও উজর হিসেবে বিবেচিত হবে। দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে গেলে যার অজু ভেঙ্গে যায় সে বসে আদায় করবে। কোন কিছুতে ভর করে যদি দাঁড়িয়ে আদায় করা সম্ভব হয় তবে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করবে। যদি কারো পক্ষে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না হয় তবে সে তাক্ববীর ই তাহরীমার সময় দাঁড়াবে পরবর্তীতে ব্যথা বাড়লে বাকী নামাজ বসে আদায় করবে।
ভূমিতে সেজদা করতে অক্ষম হলে দাঁড়িয়ে নামাজ শুরু করবে রুকু করবে এবং পরে সেজদার জন্য বসে যথাসম্ভব মাথা ঝুঁকিয়ে ইঙ্গিতের মাধ্যমে আদায় করবে। বসে নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি রুকুর জন্য সামান্য আর সেজদার জন্য তার চেয়ে বেশী ঝুঁকবে। উঁচু কোন কিছুর উপরে সেজদা করা জরুরী নয় বরং মাকরুহ। তবে উঁচু কোন কিছুর উপরে সেজদা করলে আর তাতে রুকুর চেয়ে অধিক ঝুঁকা হলে নামাজ সহীহ হবে। কোন কিছুতে হেলান দিয়ে বসে নামাজ আদায় করা সম্ভব হলে শুয়েশুয়ে ইশারার মাধ্যমে আদায় করা জায়েজ হবে না । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা এক অসুস্থ সাহাবীকে যিয়ারতে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন যে,সাহাবী হাত দিয়ে একটি বালিশ তুলে তাতে সিজদা করছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বালিশটি নিয়ে নিলেন। তখন সাহাবী একটি কাঠ তুলে তাতে সিজদা করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ কাঠটিও নিয়ে নিলেন এবং বললেন,“সামর্থ্য থাকলে জমিনে সিজদা কর। জমিনে সিজদা করতে না পারলে, কিছু মুখের কাছে তুলে তার উপর সিজদা কর না। তখন ইশারায় নামাজ পড় ও সিজদায় রুকুর চেয়ে অধিক ঝুঁক” ‘বাহরুর রাইক’ নামক কিতাবে, সূরা আলে ইমরান’এর একশ একানব্বইতম আয়াতে করীমার ভাবার্থে বলা হয়েছে যে ‘যার সামর্থ্য আছে সে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে,অক্ষম হলে বসে পড়বে,তাতেও অক্ষম হলে শুয়ে পড়বে”। হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু যখন অসুস্থ হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, “দাঁড়িয়ে নামাজ পড় এতে অক্ষম হলে বসে পড়,তাতেও যদি সামর্থ্য না থাকে তবে পাশ ফিরে কিংবা চিৎ হয়ে শুয়ে নামাজ আদায় কর”। অতএব বুঝা যাচ্ছে যে, অসুস্থ ব্যক্তির কিংবা বাসে ট্রেনে বিমানে ভ্রমণকারী ব্যক্তির চেয়ারে বা আসনে বসে নামাজ আদায় করাটা শরীয়ত অনুযায়ী হয় না। মসজিদের মধ্যে চেয়ার বা আসনে বসে,ইশারার মাধ্যমে নামাজ আদায় করা জায়েজ নয়। ইসলামিয়্যাত যা অবহিত করেনি,সেভাবে ইবাদত করা বিদায়াতের শামিল। আর বিদায়াতের কাজ করা কবীরা গুনাহ এ ব্যাপারে ফিকাহের কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে।
অসুস্থ ব্যক্তি যদি কোন কিছুতে ভর দিয়েও বসতে অক্ষম হয় তবে চিৎ হয়ে শুয়ে নামাজ আদায় করবে,চিৎ হয়ে শুতে না পারলে ডান কাঁত হয়ে শুয়ে মাথার দ্বারা ইশারা করে নামাজ আদায় করবে। চিৎ হয়ে শোয়া ব্যক্তির মাথার নিচে কিছু রেখে,চেহারাকে কিবলামুখী করে দিতে হবে। এসময় হাঁটু খাঁড়া করে রাখা উত্তম।
কেউ যদি মাথা দিয়েও ইশারা করে নামাজ আদায়ে অক্ষম হয় তবে সে ঐ অবস্থার নামাজগুলিকে ক্বাযা করা জায়েজ হবে। নামাজরত অবস্থায় কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে,বাকী নামাজ যেভাবে সামর্থ্য হয় সেভাবে আদায় করবে। বসে নামাজ আদায়কারী অসুস্থ ব্যক্তি নামাজরত অবস্থায় সুস্থ হলে, বাকী নামাজ সুস্থ ব্যক্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আদায় করবে। যার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে কিংবা জ্ঞান হারায়,তার নামাজ আদায় করতে হয় না। এই অবস্থা থেকে পাঁচ ওয়াক্ত অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই স্বাভাবিক হলে ঐ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ক্বাযা করতে হবে। ঐ অবস্থা যদি পাঁচ ওয়াক্তের চেয়ে বেশি স্থায়ী হয় তবে সেই ওয়াক্তগুলির নামাজ ক্বাযা আদায় করতে হবে না৷
ইশারার দ্বারাও যে সমস্ত নামাজ আদায় করা সক্ষম হয়নি, অতি দ্রুত সেগুলির ক্বাযা আদায় করা ফরজ। ক্বাযা আদায়ের পূর্বেই ব্যক্তির মৃত্যু হলে,যত ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়নি সেগুলির জন্য রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ‘ফিদিয়া’ দেয়ার জন্য অসিয়ত করে যাওয়া তার জন্য ওয়াজিব হবে। ঐ ব্যক্তি যদি অসিয়ত করে না যায়,তবুও ওয়ারিশগণের জন্য এমনকি অন্য যে কারো জন্য নিজেদের সম্পদ থেকে তার নামাজের ইসকাত করা জায়েজ হবে বলে উল্লেখ আছে।
