নামাজের হাক্বীকত
ইসলামের প্রসিদ্ধ আলেম হযরত আবদুল্লাহ দেহলেভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার ‘মাকাতিবই শরীফা” নামক কিতাবের ৮৫তম মাকতুবে বলেছেন যে আমাদেরকে নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা,রুকুর পরে কাওমা করা (সোজা হয়ে দাঁড়ানো)এবং দুই সেজদার মাঝে জালসা করা(সোজা হয়ে বসা, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন। রুকুর পরে দাঁড়ানো ও দুই সেজদার মাঝে বসা অনেক আলেমের মতে ফরজ। হানাফী মাজহাবের মুফতী কাজী খান এ ব্যাপারে বলেছেন যে, এই দুটি নামাজের ওয়াজিবের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো র কোন একটি ভুলে আদায় না করলে সাত্তু সেজদা করা ওয়াজিব হয়,আর ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে। যারা এই দুইটিকে সুন্নতই মুয়াক্কাদা হিসেবে বিবেচনা করেছেন তারাও একে ওয়াজিবের কাছাকাছি সুন্নত বলেছেন। সুন্নতকে গুরুত্বহীন ভেবে,অবজ্ঞা করে ত্যাগ করলে কুফুরী হবে।
নামাজের কিয়ামে, রুকুতে কাওমা করাতে, জালসাতে, সেজদাতে ও বসার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার প্রকাশ পায় যার সবগুলোই আলাদা আলাদাভাবে গুরুত্ব বহন করে। আসলে এর মধ্যমে সমস্ত ইবাদতকে নামাজের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেমন, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ তথা সুবহানাল্লাহ বলা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দুরুদ ও সালাওয়াত পাঠ করা, কৃত গুনাহসমূহের জন্য ইস্তিগফার ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং যাবতীয় চাহিদা ও প্রয়োজনের কথা শুধুমাত্র আল্লাহ্ তায়ালার দরবারে পেশ করে তার সাহায্য কামনা করে দোয়া করা এগুলো র সবই নামাজের মাঝে নিহিত রয়েছে। বৃক্ষরাজি নামাজের কিয়ামের মত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পশুরা রুকুর মত আর জড় পদার্থরা নামাজের শেষ বৈঠকে বসার মত করে জমিনে অবস্থান করছে। নামাজ আদায়কারী ব্যাক্তি সমস্ত সৃষ্টির ইবাদতের ন্যায় ইবাদত করতে সক্ষম হয়।
নামাজ,মিরাজ রজনীতে ফরজ করা হয়েছে। ঐ রাতে মিরাজ তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা অর্জনকারী আল্লাহ্র প্রিয় পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ ও অনুকরণ করার কথা ভেবে যে মুসলমান ব্যাক্তি নামাজ আদায় করবে, সে ঐ মহান পয়গম্বরের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মত আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের পথে ধাপে ধাপে মর্যাদার স্তর পার হয়ে সম্মানিত হতে থাকবে। যারা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে তার প্রিয় রাসুলের অনুসরণ করে আদবের সাথে নম্র ও বিনয়ী হয়ে হুজুর তথা একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করতে পারবে তারা কতটা সম্মানিত মাকামে (স্তরে) পৌঁছেছে তা নিজেরাই উপলব্ধি করতে পারবে। মহান আল্লাহ তায়ালা ও তার পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতি দয়ার বশবর্তী হয়ে এই উম্মতকে বড় ধরনের অনুগ্রহ করেছেন, নামাজকে ফরজ করেছেন। এজন্য আমাদের মহান প্রভুকে অসংখ্য ধন্যবাদ, হামদ ও শুকরিয়া জানাই। তার প্রিয় পয়গম্বরের উপর দুরুদ ও সালাওয়াত পাঠ করি তাহিয়্যাত জানাই এবং দোয়া করি।
নামাজ আদায়ের সময় যে আধ্যাত্মিক শান্তি ও তৃপ্তি অর্জিত হয় তা বর্ণনাতীত। আমার ওস্তাদ মাজহার ই জানই জানান বলেছেন যে, ‘নামাজ আদায়ের সময় আল্লাহ তায়ালাকে দেখা সম্ভব না হলেও যেন উনাকে দেখছি এমন একটি হাল বা অবস্থা অর্জিত হয়’ ' তাসাউফের সকল মহান ব্যাক্তিত্বই এই হালের অর্জিত হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত প্রকাশ করেছেন।
ইসলামের শুরুর দিকে কুদুসের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করা হত। যখন বাইতুল মুকাদ্দাস থেকে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাজ আদায়ের আদেশ এল তখন মদিনার ইহুদিরা অসন্তুষ্ট হলো। তারা মুসলমানদের জিজ্ঞাসা করল, এতদিন যে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে ফিরে নামাজ আদায় করেছ তার কি হবে, তাদের এই প্রশ্নের জবাব হিসেবে মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ১৪৩তম আয়াতে এরশাদ করেছেন যে, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ঈমানকে নষ্ট হতে দিবেন না'। অর্থাৎ তোমাদের আদায়কৃত নামাজসমূহ বিনিময়হীন থাকবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এখানে নামাজের জায়গায় ঈমান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকেই বুঝা যায় যে,নামাজকে সুন্নত (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পন্থা অনুযায়ী আদায় না করা হলে ঈমানকে নষ্ট করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে‘আমার চোখের নূর ও স্বাদ,নামাজের মাঝে রয়েছে”। এই হাদিস শরীফের ব্যাখ্যা হলো,নামাজের সময় মহান আল্লাহ তায়ালা দেখা দেন আর তার দর্শন পেয়ে আমার চোখ তৃপ্তি পায়। এক হাদিস শরীফে আছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ‘হে বিলাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে প্রশান্তি দাও’'#এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন,হে বিলাল আযান দিয়ে নামাজের ইকামত দিয়ে আমাকে প্রশান্তি লাভ করাও। নামাজ ছাড়া অন্য কিছুর মাঝে পরিতৃপ্তির অন্বেষণ গ্রহণযোগ্য নয়। যে নামাজকেই সঠিকভাবে আদায় করতে পারে না, একে পরিত্যাগ করে সে দ্বীনের অন্যান্য দ্বায়িত্বসমূহ আরো বেশি পরিমাণে ত্যাগ করে ।
নামাজের ফজিলত
মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী ইমাম রব্বানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার ‘মাকতুবাত’ নামক কিতাবের প্রথম খন্ডের দুইশ একষট্টিতম পত্রে বলেছেন যে এই বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই জানা দরকার যে, নামাজ ইসলামের পাঁচটি শর্তের দ্বিতীয়টি। সকল ধরনের ইবাদতকে নিজের মাঝে শামিল করেছে। ইসলামের এক পঞ্চমাংশ, কিন্তু সবধরনের ইবাদতকে নিজের মাঝে একত্রিত করার মাধ্যমে নামাজ একাই মুসলমানিত্বের ধারক বাহক ও পরিচায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানুষের জন্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের যতগুলি মাধ্যম রয়েছে নামাজ তার মধ্যে প্রধানতম। সমস্ত নবী রাসূলের সর্দার প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম,মিরাজ রজনীতে মহান আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। তার এই দর্শন পার্থিব জীবনে ফিরে আসার পরে দুনিয়ার উপযোগী করে শুধুমাত্র নামাজের মাঝে সীমিত করে দেয়া হয়েছে। আর এজন্যই হাদিসে বর্নিত আছে যে, ‘নামাজ, মুমিনের মিরাজস্বরূপ' '#অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে ‘নামাজের সময়ই মানুষ মহান আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। যথার্থভাবে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসারী আল্লাহ্ প্রিয় বান্দারা,রাসূলের মহান মিরাজ থেকে এই দুনিয়াতেই আংশিকভাবে ভাগীদার হয়। আর তা শুধুমাত্র নামাজের দ্বারাই অর্জন করা সম্ভব। এটা সত্য যে, এই দুনিয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালার পবিত্র দর্শন অর্জন করা সম্ভব নয়। দুনিয়ার প্রেক্ষাপট এর জন্য উপযোগী নয়। তথাপি যারা নিষ্ঠার সাথে পরিপূর্নভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী হলো, সেইসব বুজুর্গ ব্যাক্তিরা শুধুমাত্র নামাজ আদায়ের সময় নবীজীর মিরাজ থেকে কিছুটা বরকত অর্জন করে থাকে। যদি নামাজ আদায়ের জন্য আদেশ না দেয়া হত তবে চূড়ান্ত মাকসাদ্-এর সুন্দর রূপ থেকে পর্দা কে সরাত কি করে আশিকরা তার মাশুককে খুজে পেত, নামাজ,দুঃখ ভারাক্রান্ত রূহকে স্বাদের যোগান দেয়। অসুস্থ হৃদয়ে প্রশান্তির শীতল বাতাস বৈয়ে দেয়। নামাজ হলো রূহের খাবার, ক্বালবের শিফা বা আরোগ্যের মাধ্যম। নামাজের জন্য আযানের আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে ‘হে বিলাল! আমাকে প্রশান্তি দাও? এইভাবে বলার মাধ্যমে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই বুঝিয়েছেন আর ‘নামাজ,আমার ক্বালবের আনন্দ ও চোখের মনি’ এই হাদিস শরীফের দ্বারাও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। স্বাদসমূহ প্রাপ্তিসমূহ জ্ঞান ও মারিফাত মাকামসমূহ নূর ও আলোসমূহ রংসমূহ ক্বালবের প্রশান্তি ও তৃপ্তি বুঝা না বুঝা তাজাল্লীসমূহ সিফাতসহ কিংবা সিফাতহীণ প্রকাশের যে কোনটি নামাজের বাইরে অর্জিত হলে এবং নামাজের হ্বাকীকত থেকে কিছুই বুঝতে না পারলে,যা কিছু অর্জিত হয়েছে তা কেবলই ছায়া, প্রতিফলন ও প্রতিচ্ছবি হিসেবে অর্জিত হয়েছে। যা মূলত অবাস্তব ধারনা ও কল্পনা বৈ আর কিছু নয়। নামাজের হ্বাকীকতকে প্রকৃত অর্থেই বুঝতে পেরেছে এমন কামিল ব্যাক্তি যখন নামাজে দাঁড়ায়,তখন সে যেন এই দুনিয়া থেকে বের হয়ে আখিরাতের জীবনে প্রবেশ করে এবং আখিরাতের জন্য খাঁচ এমন কিছু নিয়ামত থেকে কিছুটা অর্জন করতে সফল হয়। মাঝে কোন ধরনের প্রতিফলন,কল্পনার মিশ্রণ ব্যাতীত সরাসরি মূল থেকে আধ্যাত্মিক স্বাদ অর্জন করে। কেননা দুনিয়ার যাবতীয় নিয়ামত ও পূর্নতা মূলত রূপকভাবে ও আসলের দৃশ্যমান ছায়া হিসেবে অর্জিত হয়। মাঝে কোন ধরণের পর্দা কিংবা কৃত্রিমতার অবকাশ না দিয়ে সরাসরি মূল থেকে স্বাদ আস্বাদন করা আখিরাতের সাথে সম্পর্কিত। তাই দুনিয়ায় থাকা অবস্থায় মূলের থেকে স্বাদ পেতে হলে মিরাজ তথা উর্ধগমন (নাফসের পরিশোধন ও উন্নয়ন) করা আবশ্যক হয়। মুমিনের জন্য নামাজই মিরাজ। এই নিয়ামত শুধুমাত্র এই উম্মতের জন্যই বরাদ্ধ করা হয়েছে। এই উম্মত স্বীয় পয়গম্বরের অনুসরণের মাধ্যমে এই সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে। কেননা তাদের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাজের রজনীতে দুনিয়ার জগতকে পিছনে ফেলে আখিরাতের জগতে ভ্রমণ করেছিলেন। জান্নাতে প্রবেশ করেছেন এবং মহান আল্লাহ্র দর্শনপ্রাপ্ত হয়ে সৌভাগ্যবান হয়েছিলেন। হে মহান প্রতিপালক! আমার রব! অনুগ্রহ করে তুমি ঐ মহান পয়গম্বর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের পক্ষ থেকে তার মহানত্বের যথোপযুক্ত প্রতিদান ও পুণ্য ইহসান কর। একইসাথে সমস্ত নবী-রাসূল ‘আলাইহিমুস সালাম ওয়াস সালাওয়াত' কে অসংখ্য সওয়াব ও পুণ্য দান কর, যুগে যুগে যারা মানবজাতিকে তোমার পরিচয় বাতলে দিয়েছেন, তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আহবান করেছেন এবং তোমার পছন্দনীয় পথ প্রদর্শন করেছেন।
তাসাউফের পথে গমনকারীদের মধ্য থেকে অনেকেই, নিজেদেরকে নামাজের হাক্বীকত সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত না করার কারণে, নামাজের সাথে সম্পর্কিত সৌন্দর্য, পূর্নতা ও স্বাদের সাথে পরিচয় না করিয়ে দেয়ার কারণে, নিজেদের সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্য বিভিন্ন উপায়ের সন্ধান করেছে। নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন মাধ্যমকে আঁকড়ে ধরেছে। এমনকি এদের কেউ কেউ, নামাজকে এই পথের বাইরের কিছু ভেবেছে, মাকসাদের (মূল লক্ষ্যের সাথে সম্পর্কহীন মনে করেছে। রোজাকে নামাজের চেয়ে উত্তম ধারণা করেছে। যারা নামাজের হাক্বীকতকে বুঝতে সক্ষম হয়নি তাদের মধ্য থেকে অনেকেই মনোযাতনাকে লাঘব করার জন্য, রূহকে তৃপ্ত করার জন্য সিমা' (তাসাউফী গান) ও সুরে অর্থাৎ সংগীতের মাঝে, আত্মহারা হওয়ার মাঝে সমাধান খুঁজে বেরিয়েছে। নিজেদের মাকসাদকে, মাশুককে সংগীতের পর্দার অন্তরালে মনে করেছে। একারণে গানবাজনায় লিপ্ত হয়েছে। অথচ তারা “আল্লাহ্ তায়ালা হারামের মাঝে শিফা তথা আরোগ্যদানকারী কোন প্রভাব সৃষ্টি করেননি” হাদিসটি সম্ভবত শ্রবণ করেছে। আসলে, আনাড়ি সাঁতারু ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে হাতের কাছে যা কিছু পায়, তা শুঁকনো খড় হলেও ধরে বাঁচতে চায়। ইশক্ তথা প্রেম, আশিককে বধির ও অন্ধ করে দেয়। তাদেরকে যদি নামাজের সৌন্দর্য থেকে একটা কিছু আস্বাদন করানো যায়, তবে তারা সিমা ও সুরের কথা মুখেও আনত না! আত্মহারা হওয়ার (তাসাউফী বিশেষ পদ্ধতিতে নিজেকে সম্পূর্নরূপে ভুলে যাওয়ার কথা কল্পনাতেও আনত না।
হে আমার ভাই! নামাজে প্রাপ্ত আত্ম তৃপ্তি এবং গান শোনার তৃপ্তির মধ্যে পার্থক্য ঠিক ততোটা, যতটা নামাজ এবং গানের মধ্যে দূরত্ব। জ্ঞানী ব্যাক্তিরা সিদ্ধান্ত নেবেন কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা লাভজনক ইবাদাতের আনন্দ নেয়া এবং এটি পালনের সময় একঘেয়েমিতে না ভোগা আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় রহমত। বিশেষ করে নামাজের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত যায়। ফরজ নামাজের স্বাদ আস্বাদনের আনন্দ তাদের যারা পরিপূর্ণ ভাবে নামাজ আদায় করে শেষ পর্যন্ত। যারা কাছাকাছি পর্যন্ত আসে তারা নফল নামাজের স্বাদ পায়। যাইহউক শেষ পর্যন্ত, শুধু মাত্র ফরজ নামাজের স্বাদ পাওয়া যায়। নাফল নামাজের স্বাদ পাওয়া যায় না, ফরজ নামাজের রয়েছে অশেষ রহমত।
[নফল নামাজ সেগুলো, যেগুলো ফরজ বা ওয়াজিব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে এবং পরের নামাজ সুন্নাত, অন্যান্য ওয়াজিব নয় যেসব নামাজ সেগুলো নফল। সকল সুন্নাত নামাজ, মুয়াক্কাদা অথবা মুয়াক্কাদা নয় সব গুলোই নফল].
নামাজের আনন্দ নাফস বুঝতে পারে না। যখন মানুষ নামাজের আনন্দ পেতে শুরু করে তখন তার নাফস বিলাপ এবং কান্না শুরু করে। হে আমাদের আল্লাহ! এটি কি ধরনের উত্তাপ! যেসকল মানুষের আমাদের মত দুর্বল আত্মা রয়েছে, এটি একটি রহমত এবং এই শোনাও সুখের।খুব ভালো করে জেনে রাখতে হবে, দুনিয়াতে নামাজ আদায় করা আল্লাহ তায়ালাকে দর্শনের মতই। এই পৃথিবীতে, মানুষ নামাজ আদায়ের সময় আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে কাছের মানুষ৷ অতঃপর এটি হচ্ছে সেই সময় যখন সে আল্লাহ তায়ালাকে দর্শন করে। পৃথিবীতে সকল ইবাদাত মানুষকে অন্য একটি মর্যাদায় উন্নীত করে যা নামাজ আদায়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আসল কারণটি হচ্ছে নামাজ আদায় করা। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে একজন অশেষ রহমত এবং চিরায়িত কল্যাণ লাভ করতে পারে।
নামাজ সমস্ত ইবাদতের থেকে অধিক মূল্যবান। নামাজ এমন হয় যে, ভগ্ন ক্বালবকে আনন্দের দ্বারা পূর্ণ করে। নামাজ এমন হয় যে, গুনাহসমূহকে বিলুপ্ত করে। মানুষকে পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করে। হাদিস শরীফে বলা হয়েছে যে, ‘নামাজ হলো ক্বালবের আনন্দ ও উৎফুল্লতার উৎস'। নামাজ দুঃখ ভারাক্রান্ত রূহসমূহকে প্রশান্তি দেয়। নামাজ হলো রূহের খোরাক, ক্বালবের জন্য শিফা। প্রকৃত নামাজে এমন মুহূর্ত আসে যখন, আরিফের ভাষা মূসা আলাইহিস্ সালামের সাথে কথা বলা গাছের মত হয়।
ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী আহমদ বিন আবদুল আহাদ ফারুকী সেরহিন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার মাকতুবাত কিতাবের প্রথম খণ্ডের তিন শত ছেষট্টি নম্বর মাকতুবাতের মধ্যে লিখেছেন :
ইমান এবং ইতিকাদের [যে মতবাদগুলো বিশ্বাস করতে হবে] সংশোধনের পর ফিকাহ [যে কাজ গুলোর নির্দেশ এবং নিষেধ করা হয়েছে আমাদের ধর্মে] শাস্ত্রের নিয়ম কানুন জানতে হবে। কোন ব্যাক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী ফরজ,ওয়াজিব, হালাল এবং হারাম,সুন্নাত, মাকরুহ এবং সন্দীহান কাজ সমূহ সম্পর্কে জানতে হবে এবং সেই হুকুম অনুযায়ী ইবাদাত করতে হবে। ফিকাহ কিতাব সমূহ পড়ে জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এগুলো জানা ছাড়া কেউ মুসলিম হতে পারে না। প্রত্যেকের উচিত আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মেনে চলা এবং সে পথে চলা যে পথে তিনি খুশি হউন। আল্লাহ তায়ালা সবচেয়ে বেশী ভালোবাসেন এবং নির্দেশ দিয়েছেন সঠিক সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। নামাজ ধর্মের খুঁটি, আমরা নামাজের গুরুত্ব এবং কিভাবে নামাজ আদায় করতে হবে তা বর্ণনা করবো। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনুন, প্রথমেই সুন্নাত অনুযায়ী ওজু করতে হবে, যেমনটা ফিকাহ কিতাবে লেখা রয়েছে। ওজুর সময় অবশ্যই অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো তিনবার ভালভাবে সম্পূর্ণরূপে ধৌত করতে হবে। এভাবে, সুন্নাতের মত করে ওজু সম্পন্ন করতে হবে। হাতে মাসেহ করার সময় সম্পূর্ণ হাত পরিষ্কার করতে হবে বা ধৌত হবে। কান এবং ঘাড় খুব ভালো করে মাসেহ করতে হবে। পায়ের আঙ্গুলের মধ্যে খিলাল করার সময়, বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে ফাকা স্থানগুলো পরিষ্কার করতে হবে ভালভাবে। । এটিতে অবশ্যই গুরুত্ব দেয়া দরকার, এটিকে মুস্তাহাব বলে বাদ দেয়া উচিত নয়। মুস্তাহাব পরিত্যাগ করা যাবে না। এগুলো আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। এটি জানা উচিত, তিনি যা ভালবাসেন তা করার জন্য পুরো পৃথিবী দিয়ে দেয়া যেতে পারে, যারা এটি পালন করে তারা অনেক সওয়াব পায়, এটি ঠিক এরকম সামান্য পাত্রের ভাঙ্গা টুকরোর জন্য হীরের টুকরো লাভ করা কিংবা কিছু নুড়ি পাথরের বদলে মৃত প্রিয় মানুষের জীবন ফেরত পাওয়ার মতন। নামাজ মুমিনদের জন্য মিরাজ স্বরূপ। এটি একটি রহমত যা শুধুমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতদের দেয়া হয়েছে মেরাজের রজনীতে। ফরজ নামাজ জামাতের সাথে আদায় করতে হবে এমনকি ইমামের সাথে প্রথম তাকবির ছাড়া যাবে না। নারী পুরুষ একসাথে জামাতে মসজিদে নামাজ আদায় করা, বা কুরআনে কারিম শোনা বা জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়া সওয়াব হাসিলের পরিবর্তে পাপের কারণ হতে পারে।
নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করা প্রয়োজন এবং জানা প্রয়োজন এটি নির্ধারিত সময়ে আদায় করা হয়েছে। যখন মানুষ একাকী থাকে তখন নামাজের সময় হলে সাথে সাথে নামাজ আদায় করবেন, বিকেল এবং সন্ধ্যার নামাজ ইমাম ই ইজমা অনুযায়ী আদায় করতে হবে। নামাজ যত দেরিতে আদায় করা হয় তার সওয়াব ততো কমতে থাকে। নামাজ আদায়ের জন্য মুস্তাহাব সময় জামাতের জন্য এবং মসজিদে জাওয়ার জন্য। যদি কোন নামাজের সময় পার হয়ে যায় তবে একজন মানুষকে খুনের পাপের সমান পাপী হবেন। এটির ক্বাযা আদায়ের পরেও এই পাপ ক্ষমা করা হয় না, তাকে তওবা ই নাসুহা অথবা হাজ্জে মারুর করতে হবে (ইবনে আবেদিন)।
নামাজের মধ্যে ঠিক ততটুকু কুরআন কারিম থেকে পাঠ করতে হবে, ঠিক যতটা সুন্নাত। সকল শর্তের অধীনে রুকু এবং সিজদায় নড়া চড়া থেকে বিরত থাকবে। কেননা এটি ফরজ অথবা ওয়াজিব। রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় এমন ভাবে দাঁড়াতে হবে যাতে শরীরের সকল হাড় স্বাভাবিক অবস্থায় আসে। এরপরে কিছুক্ষণ এভাবে থাকা ফরজ অথবা ওয়াজিব অথবা সুন্নাত।
একইভাবে দুই সিজদার মাঝখানে বসতে হবে। এই বিষয়গুলোতে অত্যন্ত মনোযোগ দেয়া উচিত। রুকু এবং সিজদায় কমপক্ষে তিনবার তাসবিহ পাঠ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি সাত অথবা এগারো বার পাঠ করতে হবে। ইমামের জন্য, এটি নির্ভর করে জামাতের উপর। কোন মানুষের জন্য একাকী নামাজ আদায়ের সময়, সে শক্তিশালী এবং কঠিন সময় না হওয়া সত্ত্বেও তিনবারের কম তাসবিহ পাঠ করা লজ্জা জনক। অন্তত পাঁচ বার এটি বলা উচিত। সিজদায় সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে পায়ের কাছের অঙ্গ মাটিতে রাখতে হবে, এরপর প্রথমে হাঁটু তারপরে হাত, অতপর নাক এবং সবশেষে কপাল জমিনে রাখতে হবে। হাঁটু থেকে হাতে প্রথমে ডানদিকে রাখতে হবে। সিজদা থেকে ওঠার সময় শরীরের উপরের অংশ প্রথমে তুলতে হবে । প্রথমে কপাল তুলতে হবে অতঃপর হাত এরপর হাঁটু উঠাতে হবে। দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় সিজদার স্থানে তাকাতে হবে, রুকুতে থাকা অবস্থায় পায়ের দিকে তাকাতে হবে, সিজদায় থাকা অবস্থায় নাকের উপরে তাকাতে হবে না, বসা অবস্থায় হাত অথবা পেটের দিকে তাকাতে হবে।
যদি কেউ উল্লেখিত জায়গা গুলোতে এবং যদি চোখে আফছা দেখা যায় না, তবে জামাতে নামাজ আদায় করা যেতে পারে। এতে করে হৃদয় দুনিয়াবি চিন্তা থেকে মুক্ত থাকবে। গভীর মনোযোগ এবং নম্র ভাবে নামাজ আদায় করতে হবে। রাসুল সাল্লাহি আলাইহিস সালাম ও এমনটি বলেছেন। রুকুর সময় আঙ্গুল সমূহ খোলা রাখা এবং সিজদার সময় একসাথে রাখা সুন্নাত। এই বিষয়গুলোতেও মনোযোগ রাখতে হবে। আঙ্গুল সমূহ খলা রাখা বা বন্ধ রাখা এমনিতেই নয়, এর জুন কারণ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমনটি করেছেন। আমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরনের চেয়ে আমলের আর কিছু হতে পারে না। আপানাদের এই কথা গুলো বলার কারণ আপনাদের এই কাজ গুলো করতে উৎসাহিত করা যা ফিকাহ কিতাবের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের রাসুলের দেখানো কাজ গুলো করার তৌফিক দান করুন। আমীন। আল্লাহ্ নামে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিমিত্ত, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলাইহি ওয়ালা আলিহি কুল্লিন মিনাস সালাওয়াতি আফদালুহা ওয়া মিনাত তাসলিমাতি আকমালুহা, আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করুন। আমীন।
ইমামে রাব্বানি রাহমাতুল্লাহ আলাইহি তার মাকতুবাত কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করণের ঊনসত্তর তম চিঠিতে লিখেছেন :
“আমার সমস্ত হামদ আল্লাহ তায়ালার জন্য এবং সালাম তার বান্দাদেরকে যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা মনোনীত করেছেন এবং ভালবেসেছেন। আপনার চিঠি পৌঁছেছে। এটি বোঝা যায় যে আমাদের বন্ধু সঠিক পথ পরিহার করেন নি এবং আমরা খুশি। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সঠিক পথে সফল করুন এবং সঠিক পথেই রাখুন।
' আল্লাহ “আমরা এবং আমাদের বন্ধুরা আপনার আরোপিত কাজ অব্যাহত রেখেছি। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করছি, পঞ্চাশ অথবা ষাট জনের জামাতে।,” আপনি বলেন। এই জন্য আল্লাহ তায়ালার হামদ জ্ঞাপন করছি। এটি কত বড় রহমত, যখন হৃদয় আল্লাহ তায়ালার হয়ে যায়, এবং শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তার নির্দেশ শারিয়াত পালন করে। এই সময়ে, অধিকাংশ মানুষ নামাজ আদায় করতে চায় না। সেই কারণেআমার প্রিয়,আপনাকে সতর্ক করতে চাই এই বিষয়ে। ভালো করে শোনেন আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:“সবচেয়ে বড় চোর সে যে নিজের নামাজে চুরি করে।” তারা জিজ্ঞেস করলেন, “ হে রাসুলুল্লাহ! একজন মানুষ কিভাবে তার নিজের নামাজ থেকে চুরি করে?” তিনি বললেন, রুকু এবং সিজদা সঠিকভাবে আদায় না করা।” অন্য একটি সময়ে তিনি বলেছেন: তায়ালা ওই ব্যক্তির নামাজ কবুল করেন না, যে সঠিক ভাবে কোমর রাখে না রুকু এবং সেজদার সময়।” একবার এক ব্যাক্তিকে সঠিকভাবে রুকু এবং সিজদা না করতে দেখে তিনি বললেন, “তুমি কি মুহাম্মাদের ধর্ম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের হয়ে মৃত্যুর ভয় করো না কেননা তুমি এভাবে তোমার নামাজ আদায় করো?” তিনি আবার বলেন, “নামাজ আদায়ের সময়, রুকুর পড়ে যদি তুমি পুরোপুরি সোজা হয়ে না দাড়াও, যদি তোমার দাঁড়ানোর ফলে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক না হয়, তোমার নামাজ সম্পন্ন হবে না।” তিনি আবার একদিন একজনকে সঠিকভাবে নামাজ আদায় না করতে দেখে বলেন, “যদি তুমি সঠিকভাবে দুই সিজদার মাঝখানে না বস তবে নামাজ সম্পন্ন হবে না।” তিনি পুনরায় একজনকে নামাজের নিয়ম ফরজ এবং রুকুন সমূহ সম্পূর্ণ রুপে আদায় না করতে দেখে, সঠিক ভাবে রুকুর পরে না দাঁড়াতে দেখে এবং দুই সিজদার মাঝ খানে সঠিক ভাবে বসতে না দেখে বললেন, “তুমি যদি এই ভাবে নামাজ আদায় করতে থাকো, কেয়ামাতের দিন তোমাকে আমার উম্মত বলা হবে না।” অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, “যদি তুমি এটি অব্যাহত রাখ এবং মারা যাও, তুমি মুহাম্মদ {সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম} এর ধর্ম অনুযায়ী মারা যাবে না।” আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “যে ব্যক্তি ষাট বছর নামাজ আদায় করেছে কিন্তু তার নামাজ কবুল হয় নি কেননা সে রুকু এবং সিজদা সঠিক ভাবে করে নি।” যাইদ ইবনে ওয়াহাব রাহমাতুল্লাহি আলাইহি একজন ব্যাক্তিকে নামাজ আদায় করতে দেখলেন যে কিনা রুকু সিজদা সঠিকভাবে করছে না। তিনি তাকে ডাকলেন, “কতদিন যাবৎ তুমি এইভাবে নামাজ আদায় করছো?” যখন বাক্তিটি উত্তর দিল, চল্লিশ বছর, তখন তিনি বললেন, “তুমি চল্লিশ বছর ধরে নামাজ আদায় করো নি। তুমি যদি এখন মারা যাও তবে রাসুলের সুন্নাতের অনুসারী হিসেবে মারা যাবে না।”.” তাবারানির আওসাত কিতাবের মধ্যে লিখা রয়েছে, বিশ্বাসীরা যারা সঠিকভাবে নামাজ আদায় করে, রুকু এবং সিজদা করে, তাদের নামাজ খুশি হয় এবং দিপ্তিমান হয়। ফেরেশতারা তার নামাজ জান্নাতে নিয়ে যায়। এই নামাজ ঐ নামাজী ব্যক্তির জন্য দোয়া করবে এবং বলবে, “যেহেতু তুমি আমাকে নষ্টের হাত থেকে রক্ষা করেছ, আল্লহ তায়ালা তোমাকে রক্ষা করবেন।” যদি নামাজ সঠিকভাবে আদায় না করা হয়, এটি কাল হয়ে যাবে। ফেরেশতারা এটি ঘৃণা করবে এবং জান্নাতে নিয়ে যাবে না। ঐ নামাজ আদায় কারি বাক্তিকে নামাজ অভিশাপ দেবে এবং বলবে, • যেহেতু তুমি আমাকে ধ্বংস করেছ এবং খারাপ ভাবে আদায় করেছ, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ধ্বংস করবেন।.” আমরা অবশ্যই তাদিল ই আরকান অনুযায়ী নামাজ আদায়ের চেষ্টা করবো, রুকু, সেজদা, কিয়াম, জালসা সঠিক ভাবে আদায় করবো। এছাড়াও আমারা অন্যান্যদের সতর্ক করবো যদি তাদেরকে ভুলভাবে আদায় করতে দেখি। আমরা আমাদের ইসলামের ভাইদেরকে সঠিকভাবে নামাজ আদায়ে সাহায্য করবো। আমরা তাদিল ই আরকান [ রুকুন সমূহ সঠিক ভাবে আদায় করা ] এবং ইতমিনান[প্রশান্তির সাথে নামায আদায় করা] র পদ্ধতি শিক্ষা দেব। বেশিরভাগ মুসলিম এই কাজটির সম্মান থেকে বঞ্চিত। এই রহমতটি ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। এই ভালো কাজটি পুনরায় সক্রিয় করা প্রয়োজন। আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কেউ যদি আমার হারিয়ে যাওয়া কোন সুন্নাত সক্ৰিয় করতে পারে তাকে একশত শহিদের মর্যাদা দেয়া হবে।” জামাতে নামাজ আদায়ের সময় আমরা অবশ্যই সতর্ক হব। কাতার তৈরি করার বিষয়ে, আমরা যে সারির অংশ তার থেকে সামনে বা পেছনে দাঁড়াবো না। সবাইকে সোজা কাতারে দাঁড়াতে হবে। আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে সারি সোজা করতেন তারপর নামাজ শুরু করতেন। তিনি বলেতেন “কাতার সোজা করা নামাজের অংশ”। হে আল্লাহ ! তোমার অফুরন্ত করুনা আমাদের উপর বর্ষণ করুন। আমাদের কাউকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করবেন না।
যদি কোন ব্যাক্তি পৃথিবীতে সমৃদ্ধি এবং আখিরাতে সুখি হতে চায়, তাকে এই তিনটি গুনে গুণান্বিত হতে হবে, কোন জীবের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ না করা, কোন মুসলিমের দুর্নাম না করা [ অবিশ্বাসীদের জিম্মি না করা, যদিও তারা মৃত হয়]। অন্নের অধিকারের কিছু ভোগদখল না করা।
নামাজের আস্ত্রার
মুজাদ্দিদে আলফে সানী,ইমামে রব্বানী কুদ্দিসা সিররুহু তার মাকতুবাত নামক কিতাবের প্রথম খণ্ডের তিনশ চারতম মাকতুবে বলেছেন যে, আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি হামদ ও শুকরিয়া জ্ঞাপনের পর ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি দুরুদ ও সালাওয়াত প্রেরণের পর তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী সৌভাগ্য অর্জনের দোয়া করছি। আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআন মজিদের বন্ধু আয়াতে করীমায়, সালিহ আমল (নেক কাজ) সম্পাদনকারী মুমিনগণের জান্নাতে প্রবেশ করার ব্যাপারে আমাদেরকে অবহিত করেছেন। এই সালিহ আমল কি ? কল্যাণকর কাজের সবগুলোই নাকি তার কয়েকটি যদি এর দ্বারা কল্যাণকর কাজের সবগুলোই উদ্দেশ্য হয় তবে কেউই তা পালন করতে সক্ষম হবে না। যদি কয়েকটি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে সেগুলি কি যা আমাদের থেকে চাওয়া হচ্ছে, অবশেষে আল্লাহ্ তায়ালা করুণা করে আমাদেরকে তা এভাবে অবহিত করেছেন যে,সালিহ আমল হলো,ইসলামের পাঁচটি রুকন বা স্তম্ভ। ইসলামের এই পাঁচটি ভিত্তিকে কেউ যদি যথাযথ উপায়ে নিখুঁতভাবে পালন করে তবে জাহান্নাম থেকে তার মুক্তির ব্যাপারে আশা করা যায়। কেননা এগুলো মূলত সালিহ আমলের অন্তর্ভুক্ত যা মানুষকে পাপাচার ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করে। এর স্বপক্ষে কুরআন করীমের সূরা আনকাবুতের পঁয়তাল্লিশতম আয়াতে বলা হয়েছে যে“যথাযথভাবে আদায়কৃত নামাজ মানুষকে অনিষ্ট ও অশ্লীল কর্ম করা থেকে বিরত রাখে”। কোন মানুষের যখন ইসলামের পাঁচটি শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করার নসীব হয়,তখন তার দ্বারা নিয়ামতের শুকরিয়াও আদায় হয়ে যায়। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা সূরা নিসা'র একশ ছিচল্লিশতম আয়াতে বলেছেন যে, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো এবং ইমানের উপর প্রতিস্থিত থাক, তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের শাস্তি দিবেন না। এমতাবস্থায়,ইসলামের পাঁচটি শর্তকে যথাযথভাবে পূরণ করার জন্য জান প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করা উচিত।
এই পাঁচটি শর্তের মধ্যে ঈমানের পরে নামাজ হলো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনের মূল স্তম্ভ। নামাজের আদবগুলি থেকে যেন কোনটি বাদ পড়ে না যায় সেজন্য সচেষ্ট থাকা উচিত। নামাজ যদি যথাযথভাবে আদায় করা যায়, তবে ইসলামের মূল ও বৃহৎ স্তম্ভকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরা হয়। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের সকলকে সঠিকভাবে নামাজ আদায় করার তৌফিক দান করুক।
নামাজে দাঁড়ানোর সময় আল্লাহু আকবর বলার অর্থ হলো, মহান আল্লাহ্ তায়ালা কোন সৃষ্টির ইবাদতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন, কোন দিক দিয়েই কোন কিছুর প্রতিই তাঁর কোন প্রয়োজন নেই, তাঁর জন্য মানুষের আদায় করা নামাজের কোন ফায়দা নাই ইত্যাদির ঘোষণা দেয়া। নামাজের মাঝে যে তাকবীর বলা হয় তা, আল্লাহ্ তায়ালার যথোপযুক্ত ইবাদতের যোগ্যতা ও সক্ষমতা যে আমাদের নেই তা প্রকাশ করে। রুকু'র তাসবীহের মাঝেও এই অর্থ নিহিত থাকায়, রুকুর পরে তাকবীরের আদেশ দেয়া হয়নি। অথচ সিজদার তাসবীহের পরে তাকবীরের আদেশ দেয়া হয়েছে। কেননা সিজদা বিনয়, নম্রতা ও ভক্তি প্রকাশের সর্বোচ্চ পর্যায় এবং নিজের তুচ্ছতা ও হীনতা স্বীকারের চূড়ান্ত পর্যায় হওয়ায়, সিজদা আদায়কারী ব্যক্তির মাঝে পরিপূর্ণ ইবাদত আদায়ের তৃপ্তি আসতে পারে। এই ধরণের চিন্তা থেকে, অতি আত্মবিশ্বাসী হওয়া থেকে রক্ষার জন্য, সিজদায় যাওয়ার ও তা থেকে উঠার সময় তাকবীর বলাকে সুন্নাত করা হয়েছে। এমনকি সিজদার তাসবীহের মাঝে ‘আ’লা’ বলার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে। নামাজ মুমিনের মিরাজ হওয়ায়, নামাজের শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মিরাজে যে অভিবাদনের দ্বারা মহিমান্বিত হয়েছিলেন সেই ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পাঠের আদেশ দেয়া হয়েছে। এ কারণেই নামাজ আদায়কারী ব্যক্তির উচিত তার নামাজকে মিরাজের পর্যায়ে উন্নীত করা। আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের চূড়ান্ত পর্যায়, নামাজের মাঝেই অন্বেষণ করা উচিত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “মানুষ তার রবের সর্বাধিক নৈকট্য, নামাজের মাঝেই অর্জন করতে পারে”। নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি, নামাজের মধ্যে তার রবের সাথে কথা বলে, তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাঁর বড়ত্ব ও মহানত্বকে উপলব্ধি করে। একারণে নামাজে মনের মধ্যে ভয়, শঙ্কা ও আতঙ্কের উদ্রেক হয়, আর এর থেকে স্বস্থি ও প্রশান্তি অর্জনের জন্য নামাজের শেষে দুইবার সালাম প্রদানের জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিস শরীফে, ফরজ নামাজের পরে তেত্রিশ বার তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ্), তেত্রিশবার তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ্), তেত্রিশ বার তাকবীর (আল্লাহু আকবর) ও একবার তাহলীল পাঠের জন্য বলেছেন। এর কারণ হলো, নামাজের মাঝের ভুলত্রুটি তাসবীহের দ্বারা মুছে দেয়া হয়।
এটি প্রমাণিত হয় যে,এভাবে উত্তম বা সঠিক ইবাদাত করা সম্ভব নয়। এটি জানা, নামাজের মাধ্যমে তার রহমত প্রাপ্ত হয় তার সাহায্যে এবং তিনি এটি সম্ভব করেন, তাহমিদের মাধ্যমে তার এই রহমতের শুকরিয়া আদায় করা হয়। তাকবির বলার মাধ্যমে, এটি প্রমান দেয়া হয় তিনি ছাড়া আর কেউ এই ইবাদাতের যোগ্য নয়। যখন কেউ শর্ত সমূহ মেনে নেয় এবং আদবের সাথে নামাজ আদায় করে, তখন তার ভুল সমূহ ঢেকে দেয়া হয়, যখন কেউ নামাজ কবুলের জন্য আল্লাহ তা'য়ালার শুকরিয়া আদায় করে, যখন কেউ হৃদয় থেকে কালেমা তাওহিদ পাঠ করে যে আল্লাহ তায়ালা ব্যাতিত কোন ইলাহ নেই ইবাদতের জন্য, তখন নামাজটি কবুল হতে পারে।
নামাজ আদায়কারী ব্যাক্তি তাদের একজন হয় যাদের নামাজ কবুল হয় এবং যারা মুক্তি পায়। হে রাব্ব, প্রিয় নবীজির দরুন, আমাদেরকে আপনার সুখি বান্দায় পরিনত করুন, যারা নামাজ আদায় করে এবং মুক্তি পায়। আমীন।
হযরত ইমাম মুহাম্মাদ মাসুম রাহমাতুল্লাহআলাইহি মাকতুবাত কিতাবের দ্বিতীয় সংস্করনের এগারো নম্বর চিঠিতে লিখেছেন:
আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অসভ্যের মত বসবাসের জন্য ছেড়ে দেন নি। তিনি তাদের যা ইচ্ছা তাই করার অনুমতি দেন নি। তিনি তাদেরকে নাফসের কিংবা প্রকৃতিক কারণে পশু বৃত্তিক অসভ্য আচরনের বা আমোদের জন্য ইচ্ছে করেন নি। তিনি তাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন, তাদের ইচ্ছার ব্যবহার করে সমৃদ্ধি এবং সুখী হওয়ার, তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন ভালো কাজের যাতে করে তারা দুনিয়া এবং আখিরাতে রহমত লাভ করতে পারে। তিনি তাদেরকে হারাম কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তার নির্দেশনা এবং নিষেধ সমূহ কে বলা হয় আহকামে ইসলামিয়্যা। যিনি পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করতে চান এবং আখিরাতে রহমত পেতে চান ইসলাম মেনে চলা ছাড়া তার কোন উপায় নেই। তাকে অবশ্যই তার নাফসের ইচ্ছা পূরন থেকে বিরত থাকতে হবে, একজনের স্বভাব যা ইসলামের বিপরীত তা পরিত্যাগ করতে হবে। যদি সে ইসলাম না মানে, তবে তাকে চরম মূল্য দিতে হবে এবং তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালার যে বান্দা ইসলাম মেনে চলে, মুসলিম অথবা মুমিন সে সুখি হবে এবং সমৃদ্ধি লাভ করবে। তার সৃষ্টিকর্তা তাকে সাহায্য করবেন। পৃথিবী শস্য ক্ষেত্র। যে মাঠে কাজ করবে না, যে পৃথিবীতে বীজ খেয়ে আমোদের মধ্যে থাকবে, সে শস্য থেকে বঞ্চিত হবে। যেমনটা, যারা পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী সুখের জন্য পুরো জীবন ব্যয় করেন, নিজের নাফসের তৃপ্তির জন্য, সে চিরায়ত রহমত এবং অশেষ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে। একজন বিবেকবান মানুষের কাছে এই
এবং অবস্থা গ্রহণ যোগ্য নয়। তিনি খারাপ কাজের মাধ্যমে দুনিয়াবি সুখ শান্তির জন্য অশেষ রহমত থেকে বঞ্চিত হতে চাইবেন না। [আল্লাহ তা'য়ালা দুনিয়াবি কোন আনন্দ কে নিষিদ্ধ করেন নি, নাফসের যা কিছু ভালো লাগে, তিনি সেগুলো করার অনুমতি দিয়েছেন যদি তা ক্ষতিকর এবং ইসলামের বিপরীত না হয়] ইসলাম পরিপূর্ণভাবে মানার জন্য, একজনের অবশ্যই আকিদার উপর বিশ্বাস থাকতে হবে, যা আহলে সুন্নার আলেমরা, আসহাবে কারিমরা, কুরআনে কারিম এবং হাদিস শারিফ থেকে শিখেছেন, এরপর একজনকে জানতে হবে হারাম কি, কোন কাজ গুলো করা নিষেধ এবং সেগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে, এরপর ফরজ সম্পর্কে জানতে হবে যা অবশ্যই পালন করতে হবে। করাকে বলা হয় ইবাদাত। হারাম থেকে সংযত হওয়াকে বলা হয় তাকওয়া। এসব পালনের মাধ্যমে ইসলাম মেনে চলার নাম হচ্ছে ইবাদাত। আল্লহ তা'য়ালার নির্দেশ এবং নিষেধ সমূহকে বলা হয়, আহকাম ই ইসলামিয়্যা এবং আহকাম ই ইলাহিয়্যা। যেগুলো নির্দেশ করা হয়েছে সেগুলো ফরজ, যেগুলো নিষেধ করা হয়েছে সেসব হারাম। ইবাদাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ভিত্তি হচ্ছে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। [নামাজ পরার অর্থ কিবলা মুখি হয়ে ফাতিহা পড়া, কিবলার দিকে নত হওয়া, কিবলার দিকে হয়ে জমিনে মাথা রাখা, যদি কেউ কিবলার দিকে না হয়ে এই কাজ গুলো করে, তবে নামাজ আদায় হবে না ।] যে নামাজ আদায় করে সে মুসলিম, যে নামাজ আদায় করে না সে মুসলিম নয়তো অবিশ্বাসী। জান্নাতের কাছা কাছি যাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে নামাজ। দুনিয়াবি চিন্তা বাদ দিয়ে তাদিল ই আরকানের সাথে তাদের নির্ধারিত সময়ে এবং ওজুর সাথে জামাতে নামাজ আদায় করা প্রয়োজন। নামাজ আদায়ের সময় আল্লাহ তায়ালা এবং বান্দার মধ্যে দূরত্ব থাকে না। যে ব্যাক্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে তার সমস্ত পাপ ধুয়ে ফেলা হয় যেমনটি কোন ব্যক্তি পাঁচবার নিজেকে পরিষ্কার করেন। যে ব্যক্তি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে তাকে একশত শহীদের সমান সওয়াব দেয়া হয়। অবশ্যই অধিনস্ত সম্পদের,পশু যা মাঠে চরে বেড়ায় তার যাকাত দিতে হবে, তাদেরকে যারা যাকাতের হকদার।
যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করেনি তার সম্পদ জাহান্নামের আগুনে পরিণত হবে। মহান দয়ালু আল্লাহ তায়ালা, বছর আন্তে অতিরিক্ত সম্পদের যাকাত দিতে নির্দেশ দিয়েছেন, যদি তা নিসাব পরিমান হয়। তিনি যদি সমস্ত সম্পদ এবং আত্মা দিয়ে দিতে বলতেন, যারা তাকে ভালবাসেন তারা সাথে সাথেই তা দিয়ে দিতেন।
নিজের ইচ্ছায় রামজানে রোজা রাখতে হবে, যেহেতু আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের জানা উচিত ক্ষুধা এবং তৃষ্ণা হচ্ছে রহমত।
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি: প্রথমে বলা ( আশহাদু আনলা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশ হাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু), এর অর্থ জানা এবং বিশ্বাস করা। এইটি কালেমায়ে শাহাদাত। অন্য চারটি হচ্ছে, নামাজ, যাকাত, রোজা,হজ্জ। এই পাঁচটির যেকোনো একটির সমস্যা থাকলে তার ইসলামে সমস্যা রয়েছে। ধর্মমত সঠিক করা এবং ইসলাম সম্পর্কে জানার পরে সফিয়্যা ই আলিয়্যার [তাসউফ] পথে যাওয়া উচিত। এই পথে মা'রিফাতুল্লাহ অর্জন করতে পারে এবং নাফসের ইচ্ছা থেকে মুক্ত রাখা যায় নিজেকে। যে বাক্তি তার সৃষ্টিকর্তাকে জানে না, সে কিভাবে বাঁচতে পারে, সে কিভাবে মুক্তি পেতে পারে। এই পথে মা'রিফাতুল্লাহ অর্জনের জন্য, ফানা বিল মারুফ প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালাকে ছাড়া বাকি সব কিছু ভুলে যাওয়ার জন্য এসবের প্রয়োজন। যে নিজেকে জীবিত ভাবে সে কখনো মারিফাত লাভ করতে পারে না। ফানা এবং বাকা সচেতনভাবে কারো হৃদয়ে ঘটে। এটি শুনে বোঝা যায় না। যারা মারিফাতের রহমত পেয়েছে তারা এটির খোঁজ করতে থাকে সব সময়।আইন এবং অস্থায়ী ভাবে যা নির্দেশ করা হয়েছে তা পরিবর্তন করার চেষ্টা করা উচিত নয়৷
নামাজের পরের দোয়া
আলহামদুলিল্লাহ্ হিরাব্বিল আলামিন। আসসালতু ওয়েসসেলামু আলা রাসুলিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলিহি ওয়া সাহিবিহি আজমাইন। হে রাব্ব, আমাদের ইবাদাত কবুল করুন যা আমারা আদায় করেছি। আমাদের শেষ নিঃশ্বাসের সময় কালেমায়ে শাহাদাত নাসিব করুন এবং ঈমানের সহিত মরার তৌফিক দান করুন। আমাদের মৃত আত্মীয় স্বজনদের ক্ষমা করুন। আল্লাহুমাগফিরলি ওয়ারহাম্মি ওয়া আন্তা খায়রুররাহিমিন। ত্বেফফিনি মুস্লেমিন ওয়া এইহিকনি বিসসালিহিন। আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়া লি ওয়ালিদায়্যে ওয়া লি উস্ততাজিয়্যা ওয়া আলহিকনি বিসসালিহিন।আল্লাহুম্মাগফিরলি ওয়া লি ওয়ালিদায়নি ওয়া লি তাক্সিয়্যা ওয়া লিমুমিনিনে ওয়েল মুমিনাত ইয়েওমে ইয়েকুমুল হিসাব। হে রাব্ব আমাকে শয়তানের কাছ থেকে রক্ষা করুন, শত্রুর শয়তান এবং নাফসের শায়তানের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমদের বাড়িতে ধার্মিকতা, হালাল এবং মঙ্গলজনক খাবার প্রদান করুন। মুসলিমদেরকে রক্ষা করুন। ইসলামের শত্রুদের বিচ্ছিন্ন এবং তুচ্ছ করুন। আপনার স্বর্গীয় সাহায্যে, সাহায্য করুন অবিশ্বাসীদের বিরুধে জীহাদকারিদের। আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুবুন কেরিমুন তুহিব্বুল আফ্বা ফাফু আন্নি। হে রাব্ব আমদের মধ্যে অসুস্থদের সুস্থতা দান করুন, যারা সমস্যার মধ্যে আছে তাদের সমস্যার সমাধান করুন। আল্লাহুম্মা ইন্নি এসেলুকেসসিহহাতে ওয়েল আফিয়েতে ওয়আল আমান্তা ওয়া হুসুলস্থুলকি ওয়াঋদাঈ বিলকাদেরি বিরাহ মাতিকা ইয়া রাহ মানার রাহিমিন। হে রাব্ব আমাদের একটি উপকারি জীবন দাআন করুন, ভালো চরিত্র, ভালো মন, ভালো স্বাস্থ্য এবং ইস্তিকামাত দান করুন ।
(সঠিক এবং সত্য পথে থেকে যা আল্লাহ তা'য়ালা পছন্দ করেন), আমার পিতামাতা, সন্তান, আমার আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এবং আমার সকল ধর্মীয় ভাইকে। আমীন। ওয়ালহামদুলিল্লাহ রাব্বিল আলামিন। আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়ালা আল্লাহুম্মা বারিক আলা আল্লাহুম্মা রাব্বানা আতিনা ওয়াল হামদুলিল্লাহ রাব্বিল আলামিন। আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহিল আযিম আল্কেরিম আল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুব আল হায়্যাউল কায়্যুম ওয়া এতুবু ইলায়হ
দোয়া কবুলের শর্ত:
১-মুসলিম হওয়া।
২- আহলে সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে। এই জন্য চার মাজহবের যেকোনো একটি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
৩-ফরজ পালন করা। ক্বাযা নামাজ আদায় করতে হবে এমনকি রাতের সুন্নাত এবং অন্যান্য ইবাদাতের বদলে। সুন্নাত নফল এবং অন্যান্য ইবাদাত জার ফরজ নামাজের কাজ আছে তার ক্ষেত্রে কবুল হবে না। অর্থাৎ যদি সেগুলো থাকে তবে কোন সওয়াব পাওয়া যাবে না। শয়তান মুসলিমদের পথ ভ্রষ্ট করার জন্য, ফরজ নামাজের গুরুত্ব কমিয়ে দেয় এবং সুন্নাত এবং নফল বেশী আদায়ে উৎসাহিত করে। নামাজের জন্য নির্ধারিত সময়ের শুরুতেই নামাজ আদায় করতে হবে।
৪-হারাম পরিত্যাগ করতে হবে। যারা হালা খাবার খায় তাদের দোয়া কবুল হয়।
৫- আল্লাহ তা'য়ালার প্রিয় কোন আওলয়িার মাধ্যমে দোয়া করতে হবে। ভারতের অন্যতম আলেম মুহাম্মাদ আহমেদ বিন যাহিদ, তারগীবুস সালাত কতাবের চুয়ান্ন তম অধ্যায়ে ফার্সি ভাষায় বলেছেন: “হাদিস শারিফের মধ্যে বলা হয়েছে : (দোয়া কবুলের জন্য অবশ্যই দুটি কাজ করতে হবে। প্রথম, ইখলাসের সাথে দোয়া করতে হবে। দ্বিতীয়, খাবার এবং পোশাক হালাল হতে হবে। যদি বিশ্বাসীদের ঘরে হারামের ভয় থাকে, ঐ ঘরে দোয়া কবুল হবে না।). ইখলাসের অর্থ আল্লাহ তায়ালা ছাড়া আর কোন কিছুর কল্পনা না করা এবং আল্লাহ তা'য়ালা ছাড়া আর কারও মুখাপেক্ষী না হওয়া। এই জন্য, আহলে সুন্নার আলেমদের কোথায় বিশ্বাস রাখতে হবে ইসলামের নিয়ম মেনে চলার জন্য, বিশেষ করে কোন প্রানির হাক নষ্ট না করা এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা প্রতিদিন
তাজদিদ ই ইমান দোয়া
হে রাব্ব, আমি অনুতপ্ত, আমি সকল ভুলের জন্য দুঃখিত, ইসলামের শত্রুদের এবং মত বিরোধীদের প্ররোচনায় ত্রুটি পূর্ণ বিশ্বাসের জন্য, সকল মত বিরোধী কথা যা আমি বলেছি, পাপের যে কথাগুলো বলেছি, শুনেছি, দেখেছি, এবং যেসকল পাপ কর্ম করেছি বালেগ হওয়ার পর থেকে।। আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ, আত্ম প্রত্যয়ী আমি এই সকল ভুল কাজ সমূহ থেকে বিরত থাকব। প্রথম নাবি হযরত আদম আলাইহিস সালাম এবং শেষ নবী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি তাদেরকে এবং তাদের দুজনের মাঝে আসা সকল নবী রাসুলকে বিশ্বাস করি। তাদের সকলেই সত্য এবং সত্যবাদি ছিলেন # আমান্তু বিল্লাহি ওয়া বি মা জাএ মিন ইন্দিল্লাহ, আলা মুরাদিল্লাহ, ওয়া আমান্ত বি রাসুলিল্লাহ, আমান্তু বিল্লাহি ওয়া মালাইকাতিহি ওয়া কুতুবিহি ওয়া রুসুলিহি ওয়ালিয়াওমিল আখিরি ওয়া বিলকাদেরি খায়রিহি ওয়া শেঋহি মিনাল্লাহি তা'য়ালা ওয়াল বসু বাদাল মাওতি হাককুন এশহেদু আন লা ইলাহা ইল্লাহি ওয়া আশাহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু।।
নামাজ ও স্বাস্থ্য
মুসলমানগণ, আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ হওয়ার কারণেই নামাজ আদায় করে থাকেন। আল্লাহ্ তায়ালার প্রত্যেকটি আদেশের মধ্যেই অসংখ্য হিকমত ও ফায়দা রয়েছে। তিনি যা কিছু নিষেধ করেছেন সেগুলোর মধ্যে ক্ষতি রয়েছে। মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা কিছু ক্ষতি এবং লাভ সনাক্ত করতে পেরেছেন। ইসলামের সাথে স্বাস্থ্য যেভাবে মিল রয়েছে তা অন্য কোন ধর্মে বা দর্শনে নেই। আমাদের ধর্ম আমাদের নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত জীবনের শেষ পর্যন্ত। যারা নামাজ আদায় করে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে। নামাজের কিছু উপকার নিচে তুলে ধরা হলো :
১- নামাজের কাজ গুলো ধীরে ধীরে করা হয় তাতে হৃদয় ক্লান্ত হয়ে যায় না। নামাজ যেহেতু দিনের বিভিন্ন সময় আদায় করা হয়, তা মানুষকে কর্মক্ষম রাখে। ২- যারা তাদের মাথা আটবার তাদের মাথা জমিনে রাখে তাদের শরীরে রক্ত প্রবাহ ভালভাবে ঘটে। তাদের মস্তিষ্কের কোষ গুলো ভালভাবে কাজ করে, কম বুদ্ধিমত্তা এবং ব্যাক্তিতহীন মানুষ নামাজিদের মধ্যে কম দেখা যায়। তারা বেশী স্বাস্থ্যবান হয়ে থাকে। তাদের উন্মত্তার অসুস্থতা নেই, যাকে দেমেতিয়া সেনিলিস বলা হয় আধুনিক মেডিক্যাল শাস্ত্রে।
৩- নামাজের কারণেনামাজিদের চোখে রক্তের প্রবাহ ভালোভাবে হয়। যে কারণেচোখের ভেতরের অংশে চাপের সৃষ্টি হয় এবং বাইরের অংশের লিদুইডে পরিপূর্ণ হয়। ছানি পড়া থেকে এটি রক্ষা করে ।
৪–ইবাদাতের সময় সমান ভাবে নড়াচড়া পাকস্থলির কাজে সাহায্য করে, পিত্তরস খুব সহজে কাজ করে এবং পিত্তকোষে কোন ক্ষতি করে না। তারা এনজাইম সমূহ কে নষ্ট করে দেয়। তারা কিডনি এবং ইউরনারির সংযোগ স্থাপন করে। তারা কিদনির পাথর হওয়া থেকে রক্ষা করে। মুত্র থলির ভারমুক্ত হতে সাহায্য করে।
৫- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের সময় শরীরের সকল মাংসপেশি এবং সংযোগ সমূহ ভালোভাবে কাজ করে যেগুলো সাধারনত প্রতিদিনের কাজের সময় ব্যাবহার হয় না, বিশেষ করে বাতের রোগ নির্মূল করে, মাসল তৈরি হতে শুরু করে৷
৬- পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সুসাস্থের জন্য আবশ্যক। ওজু এবং গোসলের মাধ্যমে শরীরের এবং আত্মার পবিত্রতা অর্জন হয়। নামাজ পরিষ্কার পরিচ্ছনতার অপর অপর নাম। নামাজ শারীরিক এবং মানুসিক পবিত্রতা ছাড়া আদায় করা যায় না। গোসল এবং ওজু শরীরকে পরিচ্ছন্ন করে। যারা নামাজ আদায় করে তারা শারীরিক এবং আত্মিক ভাবে পরিষ্কার।
৭-প্রতিষেধক ঔষধে, নিয়মিত শরীর চর্চা করা প্রয়োজন। নামাজের সময় গুলো নতুনভাবে রক্ত সঞ্চালন এবং নিঃশ্বাসের জন্য উপযুক্ত সময়
