নামাজ পরিত্যাগকারী
হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) বর্ণনা করেছেন যে, “যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় হয় তখন ফেরেশতারা বলে এই আদম সন্তান জাগো মানুষকে জ্বালানোর জন্য প্রস্তুতকৃত আগুনকে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে নিভিয়ে দাও” । পবিত্র হাদিস শরীফে আছে “মু’মিন ও কাফিরের মাঝের পার্থক্যকারী হলো নামাজ”। অর্থাৎ মু'মিন ব্যাক্তি নামাজ আদায় করে কাফির আদায় করে না আর মুনাফিকরা কখনো আদায় করে কখনো করে না। মুনাফিকরা জাহান্নামে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে। শাহ্ ই মুফাস্সিরিন আবদুল্লাহ ইবনি আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি যে “নামাজ পরিত্যাগকারী ব্যাক্তি কিয়ামতের দিনে মহান আল্লাহ তায়ালাকে নিজেদের প্রতি রাগান্বিত অবস্থায় দেখতে পারবে”
হাদিস ইলমের ইমামরা এই বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ওয়াক্তের নামাজ আদায় না করে কিংবা নামাজের ওয়াক্ত অতিবাহিত হওয়ার সময়ে ঐ ওয়াক্তের নামাজ আদায় করতে না পারার কারণেনিজের মাঝে যদি কোন ধরনের অনুশোচনা অনুভব না করে তবে সে কাফিরে পরিণত হয়, ঈমানহীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। এমতাবস্থায় যারা নামাজ আদায়ের ব্যাপারে কখনো চিন্তাও করল না কিংবা নামাজকে নিজেদের উপর অর্পিত একটি দ্বায়িত্ব হিসেবেই মেনে নিল না তাদের পরিণতি কি হবে, ইবাদতসমূহ ঈমানের অংশ নয় এব্যাপারে আহলে সুন্নাহআলেমদের মতৈক্য রয়েছে' শুধুমাত্র নামাজের ক্ষেত্রে মতবিরোধ রয়েছে। ফিকহ্ ইমামদের মধ্যে থেকে ইমাম আহমদ ইবনি হাম্বল,ইসহাক ইবনি রাহেওয়াইহ, আবদুল্লাহ ইবনি মুবারক,ইবরাহীম নাখাঈ,হাকিম বিন উতাইবা,আইয়্যুব সাহতিয়ানি, দাউদ তাই’, আবুবকর ইবনি শাইবা, যুবায়ের বিন হারব রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম সহ আরো অনেক বিখ্যাত আলেমরা বলেছেন যে,কেউ যদি এক ওয়াক্তের নামাজ বিনা কারণেইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করে তবে সে কাফির হয়ে যাবে। এই প্রেক্ষিতে হে আমার দ্বিনী ভাইয়েরা এক ওয়াক্ত নামাজও ত্যাগ করবেন না, এব্যাপারে অলসতাকে প্রশ্রয় দিবেন না। মনোযোগ দিয়ে আগ্রহ সহকারে নামাজ আদায় করুন। কিয়ামতের দিনে মহান আল্লাহ তায়ালার বিচার যদি উপরোক্ত আলেমদের ইজতিহাদের অনুরূপ হয় তখন কি পরিণতি হবে
হাম্বলী মাজহাব অনুযায়ী কেউ যদি বিনা উজরে কারনে ইচ্ছাকৃতভাবে এক ওয়াক্ত নামাজ পরিত্যাগ করে তবে তাকে মুরতাদের ন্যায় হত্যা করা হয়। তাকে গোসল করানো হয় না, কাফন পরিধান করানো হয় না, তার জন্য জানাজার নামাজও পড়া হয় না এমন কি মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন না করে বনজঙ্গলে কিংবা পাহাড় পর্বতে গর্ত করে সমাহিত করা হয়।
শাফী' মাজহাবে নামাজ পরিত্যাগকারীকে মুরতাদ আখ্যা দেয়া না হলেও শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। নামাজ পরিত্যাগকারীর জন্য মালেকী মাজহাবের হুকুম শাফী' মাজহাবের অনুরূপ।
আর হানেফী মাজহাবে নামাজ পরিত্যাগকারী ব্যাক্তিকে জেলে বন্দী করে রাখা হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত সে পুনরায় নামাজ আদায় করতে আরম্ভ করে। কিংবা রক্ত ঝরা পর্যন্ত প্রহার করা হয়। [ শুধুমাত্র ইসলামি আইন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে এই শাস্তি প্রযোজ্য ]
পাঁচটি কাজ না করলে পাঁচটি বিষয় থেকে বঞ্চিত হতে হয়। এগুলো হলো,
১.মাল সম্পদের যাকাত আদায় না করলে বরকত থেকে বঞ্চিত হয়।
২. উশর (ফসলের যাকাত আদায় না করলে ফলনে বরকত কমে যায়।
৩. সদকা প্রদান না করলে শারীরিক সুস্থতা লোপ পায়।
৪. দোয়া না করলে মনোবাসনা পূরণ হয় না।
৫.নামাজের ওয়াক্ত হলে তা আদায়ে অনীহা করলে শেষ নিঃশ্বাসে কালিমা- ই শাহাদাত পড়ার সৌভাগ্য হয় না'
হাদিস শরীফে বর্নিত আছে যে বিনা কারণে নামাজ পরিত্যাগকারী ব্যাক্তিকে মহান আল্লাহ তায়ালা পনেরটি কষ্ট দেন। এর ছয়টি দুনিয়াতেতিনটি মৃত্যুর সময়ে,তিনটি কবরে, তিনটি কবর থেকে উত্থানের সময় ভোগ করতে হয়৷
দুনিয়াতেই যে ছয়টি আযাব ভোগ করতে হয়
১.নামাজ পরিত্যাগকারীর জীবনে বরকত থাকে না।
২. আল্লাহ্ প্রিয় বান্দাদের চেহারায় যে নূরানী সৌন্দর্য থাকে তা তার চেহারা থেকে লোপ পায়।
৩. অন্যান্য সৎকর্মের সওয়াব অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়।
৪.তার দোয়া কবুল হয় না।
৫. কারো ভালবাসা পায় না।
৬. মুসলমানদের একে অপরের জন্য মুসল্মান হিসেবে সামষ্টিক যে দোয়া করা হয় তা থেকে তার কোন ফায়দা হয় না৷
মৃত্যুর সময় যে তিনটি শাস্তি ভোগ করতে হয়
১.মন্দ,অপদস্থ ও কুৎসিত অবস্থায় মৃত্যু হয়।
২. ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যু হয় ৷
৩. যতই পানি পান করুক না কেন পিপাসার কষ্ট নিয়ে মৃত্যু বরণ
কবরের তিনটি আযাব
১. কবর তাকে প্রচন্ড চাপ দেয়,শরীরের এক পাশের হাড্ডি অন্য পাশের হাড্ডির মাঝে প্রবেশ করে।
২.তার কবর আগুন দ্বারা পূর্ন করা হয়। তার মাঝে রাত দিন সে জ্বলতে থাকে।
৩. মহান আল্লাহ তার কবরে অতিবিশাল সাপ পাঠান যা তাকে প্রত্যেক নামাজ ওয়াক্তের সময় ছোবল মারতে থাকে। দুনিয়ার সাপের চেয়ে ওগুলি অনেক বাশী ভয়ংকর। এক মূহূর্তের জন্যও তাকে বিরাম দেয় না।
কিয়ামতের সময় বাকী যে শাস্তিগুলি ভোগ করতে হবে,
১.আযাব প্রদানের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত জাহান্নামের ফেরেশতারা সর্বদা তার সাথে থাকবে।
২. মহান আল্লাহ তার সাথে সাক্ষাতের সময় রাগান্বিত থাকবেন।
৩. তার হিসাব প্রদান অনেক কঠিন হবে। অবশেষে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
নামাজ আদায়কারীর ফজিলতসমূহ
নামাজ আদায়ের ফজিলত এবং নামাজ আদায়কারীর অর্জিত সওয়াবের ব্যাপারে খবর প্রদানকারী অনেক হাদিস শরিফ রয়েছে। আবদুল হক বিন সাইফুদ্দিন দেহলেভী রাহমাতুল্লাহ আলাইহির ‘আশিয়াতুল লুমায়া'ত' নামক গ্রন্থে নামাজের গুরুত্ব ও মহত্ব বর্ণনাকারী হাদিস শরীফসমূহে বলা হয়েছে যে
১.হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্নিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,“ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজ পরবর্তী জুমা পর্যন্ত আর পবিত্র রমজান মাসের রোজা পরবর্তী রমজান মাস পর্যন্ত কৃত যাবতীয় (সগীরা)গুনাহসমূহের কাফফারা হবে। কবীরা গুনাহ করা থেকে বিরত থাকা ব্যাক্তির সগীরা গুনাহসমূহ মাফের সবব(কারণ) হবে”' নামাজ মধ্যবর্তী সময়ে কৃত সগীরা গুনাহসমূহের মাঝে বান্দার হক হরণকারী গুনাহ ব্যতীত বাকীগুলি মুছে দেয়। মাফ পেতে পেতে যাদের সগীরাগুনাহের খাতা শূন্য হয় তাদের কৃত কবীরা গুনাহের কারণে প্রাপ্ত আযাবের তীব্রতাকে হ্রাস করে তবে মুছে দেয় না। কেননা কবীরা গুনাহ থেকে পরিত্রাণের জন্য বান্দাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে। যাদের কবীরা গুনাহ নাই তাদের আধ্যাত্মিক মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হয়। উপরোক্ত হাদিস মুসলিম শরীফেও বর্নিত হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্তের নামাজের ত্রুটিগুলি থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য জুমার নামাজসমূহ সবব(উপায়) হয়। আর জুমা নামাজসমূহের ত্রুটিগুলিকে রমজানের রোজা বিলুপ্ত করে।
২- আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘যদি কারো বাড়ির সামনে একটি পুকুর থাকে এবং সে প্রতিদিন তাতে পাঁচবার গোসল করে তার শরীরে কি কোন ময়লা থাকবে?” সাহাবিরা উত্তর দিলেন: নাহ, রাসুলুল্লাহ কিছু থাকবে না”। তিনি বললেন: “প্রতিদন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও তেমন। আল্লাহ তায়ালা, যে বাক্তি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে তার গুনাহ সমূহ মুছে দেন।” হাদিস শারিফটি বুখারি এবং মুসলিম শারিফে রয়েছে।
,
৩- আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, কোন একজন পুরুষ কোন বেগানা নারীকে চুমু খেয়েছিল। আনসারের একজন বাক্তি ঐ সময় খেজুর বিক্রি করছিলেন, এইসময় একজন নারী আসে খেজুর কিনতে ঐ নারীকে দেখে তার কামের উদ্রেক হয়। তিনি তাকে বলেন, আমার বাড়িতে আরও ভালো খেজুর আছে, আমার সাথে আসো যাতে আমি তোমাকে সেগুলো দিতে পারি। যখন তারা বাসায় পৌঁছালো, লোকটি তাকে জড়িয়ে ধরলো এবং চুমু খেল। সেই নারী তাকে বলল, কি করছেন আপনি?আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন। তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আসলেন এবং ঐ ব্যাক্তি তাঁর সাথে কি করেছেন তা খুলে বললেন। রাসুলুল্লাহ আল্লাহ্ অহির জন্য অপেক্ষা করলেন। এরপর ব্যাক্তিটি নামাজ করলো। আল্লাহ তায়ালা সূরা হুদের একশত পনের নম্বর আয়াত নাযিল করলেন: “দিনের দুই ভাগে এবং যখন সূর্য অস্ত যায় নামাজ আদায় করো। নিশ্চয় ভালকাজ খারাপ কাজকে ধ্বংস করে৷” দিনের দুই ভাগ হচ্ছে দুপুরের আগে এবং দুপুরের পরে। এটি সকাল, দুপুর এবং বিকেলের নামাজ। দিনের আলোর শেষের দিকে মাগরিবের নামাজ এবং তার কিছুখন পরে ইশার নামাজ। এই আয়াতে কারিমে বলা হয়েছে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব। লোকটি জিজ্ঞেস করলো: হে রাসুলুল্লাহ ! এটি কি শুধু আমার জন্য, নাকি সকল উম্মাতের জন্য? তিনি বললেন: “এটি সকল উম্মাতের জন্য।” হাদিস শারিফটি বুখারি এবং মুসলিম শারিফে এসেছে।
৪- আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “একজন বাক্তি রাসুল সাল্লাহি আলাইহিস সালামের কাছে আসলেন এবং বললেন: (আমি একটি পাপ করেছি যার কঠিনতম শাস্তি উচিত!) রাসুলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন না, তিনি কি পাপ করেছেন। যখন নামাজের সময় আসলো নবীজি নামাজ আদায় করলেন। লোকটি দাঁড়িয়ে রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন,আমি একটি পাপ করেছি, যার শাস্তি হওয়া উচিত। আল্লাহ তা'য়ালার কিতাব অনুযায়ী আমাকে শাস্তি দেন। তিনি বললেন : “তুমি কি আমাদের সাথে নামাজ আদায়?” লোকটি বলল : হ্যাঁ আমি করেছি। তখন রাসুলুল্লাহ বললেন : দুঃখিত হয়ো না, আল্লাহ তায়ালা তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন! এই হাদিস শারিফটি ইসলামের প্রধান দুটি কিতাব সাহিহাইন এর মধ্যে লেখা রয়েছে। লোকটি ভেবেছিল সে একটি গভীর পাপ করেছে যার কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে তার পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয় এরমানে হচ্ছে পাপটি গুরুতর ছিল না। অথবা তিনি তাযির শাস্তির বদলে হাদ্দ শব্দটি ব্যাবহার করেছেন। তিনি হাদ্দ শাস্তি অব্যাহত রাখতে চাননি এটি তাই নির্দেশ করে। হাদ্দ হচ্ছে ইসলামে বর্ণীত শাস্তির একটি মাধ্যম। তাজির শাস্তিগুলো বিভিন্ন রকমের, এগুলো ইসলামিক বিচারকার্যের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। তাজির অর্থ কোন মানুষকে ভালো ব্যাবহারের মানুষ বানানো। ইসলামে,হাদ্দের চেয়ে কম শাস্তি দিতে হবে।
৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্নিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছি আল্লাহ তায়ালার নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় আমল কোনটি তিনি উত্তরে বললেন,“যথাযথ ওয়াক্তে নামাজ আদায় করা”, কিছু হাদিস শরীফে বলা হয়েছে“ মহান আল্লাহ ওয়াক্ত হওয়া মাত্রই আদায় করা নামাজকে অধিক পছন্দ করেন”। এরপর কোন আমলটি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন(স),মা বাবার খেদমত। তারপর কোন আমলটি পছন্দ করেন, বললেন(স:), আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করাকে। এই হাদিসটি বিখ্যাত দুইটি সহিহ হাদিস কিতাব তথা বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্নিত আছে। অপর এক হাদিস শরীফে বলা হয়েছে“ সর্বোত্তম আমল হলো অপরকে খাবার খাওয়ানো”। আরেকটি হাদিস শরীফে আছে “ সালামের প্রচলন ও প্রসার হলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত”। অন্য একটি হাদিস শরীফে আছে রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ পড়া সর্বোত্তম ইবাদত”। আরেকটি হাদিসে আছে“ কারো হাত ও মুখের দ্বারা অন্য কারো কষ্ট না পাওয়াটা সবচেয়ে মূল্যবান আমল”। এক হাদিসে আছে“ জিহাদ হলো সবচেয়ে মূল্যবান আমল” অপর এক হাদিসে আছে“ সবচেয়ে মূল্যবান আমল হলো মাবরুর হজ্জ”। অর্থাৎ বান্দার হক ও কাজ্বা নামাজ না থাকা অবস্থায় যে হজ্জ আদায় করা হয়। ‘আল্লাহ্ জিকির করা” এবং ‘নিয়মিত পালন করা আমলসমূহ' সর্বোত্তম বর্ণনাকারী হাদিসও রয়েছে। এর কারণ হলো বিভিন্ন প্রশ্নকারীর অবস্থা সাপেক্ষে তাদের উপযোগী বিভিন্ন জবাব দেয়া হয়েছে। অথবা সময়োপযোগী জবাব প্রদান করা হয়েছে। যেমন ইসলামিয়্যাতের শুরুর দিকে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে মূল্যবান আমল ছিল জিহাদ। (আমাদের এই সময়ে সর্বোত্তম আমল হলো লেখনীর মাধ্যমে, প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে কাফিরদের, মাজহাব বিরোধীদের মোকাবিলা করা, আহলে সুন্নাতের ই'তিকাদকে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া' এরূপ জিহাদে লিপ্ত ব্যাক্তিদেরকে যারা অর্থ দিয়ে সম্পদ দিয়ে শ্রম দিয়ে সাহায্য করবে তারা এদের দ্বারা অর্জিত সওয়াবের ভাগীদার হবে। পবিত্র আয়াত ও হাদিস সমূহের দ্বারা বুঝা যায় যে, যাকাত ও সদকার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো নামাজ। তথাপি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জারত কোন ব্যাক্তিকে খাবার পানীয় ইত্যাদি দান করে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা নামাজ আদায়ের চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হবে। অর্থাৎ স্থান, কাল,পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন আমল অধিকতর গুরুত্ব অর্জন করে।
৬- জাবির বিন আব্দুল্লাহ বলেন : রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: (মানুষ এবং অবিশ্বাসের মধ্যে সীমানা হচ্ছে নামাজ পরিত্যাগ করা করা।) নামাজ মানুষকে অবিশ্বাসী হতে দেয় না। যদি এটি পরিত্যাগ করা হয়, মানুষ অবিশ্বাসীতে পরিণত হতে শুরু করে। হাদিস শারিফটি মুসলিম শরিফে লিখা আছে। এই হাদিসটি প্রমান করে নামাজ পরিত্যাগ করে ভুল কাজ। অনেক সাহাবী বলেছেন যারা বিনা কারণেনামাজ পরিত্যাগ করে তারা অবিশ্বাসীতে পরিনত হয়। শাফি এবং মালিকী মাজহাব অনুসারে, তিনি অবিশ্বাসী হয়ে যায় না, যাইহউক তাকে হত্যা করা ওয়াজিব। হানাফি মাজহাবের মতে তাকে প্রহার করতে হবে এবং জেলে বন্দি করতে হবে যতদিন না নামাজ আদায় শুরু করে।
৭.উবাদা বিন সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে,“ মহান আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের আদেশ দিয়েছেন। যে ব্যাক্তি সুন্দরভাবে অজু করে ওয়াক্ত মত এই নামাজগুলি পড়বে এর রুকু ও সেজদা সমূহ যথাযথভাবে আদায় করবে তাকে ক্ষমা করার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালা কথা দিয়েছেন। যে ব্যাক্তি নামাজ আদায় করল না তার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালার কোন প্রতিশ্রুতি নেই। তিনি চাইলে তাকে ক্ষমাও করতে পারেন আবার আজাবও দিতে পারেন”। এই হাদিস শরীফটি ইমাম আহমদ,আবু দাউদ এবং নাসাঈ নিজ নিজ হাদিস কিতাবে বর্ণনা করেছেন। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে নামাজের অন্যান্য শর্তসমূহসহ রুকু ও সেজদার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত' মহান আল্লাহ তায়ালা কখনই ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। অতএব, সহীহ-শুদ্ধভাবে নামাজ আদায়কারী ব্যাক্তিকে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করবেন।
৮- হযরত আবু ইমামি বাহিলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন : রাসুলুল্লাহ বলেছেন: পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়, রোজা রাখ এক মাস, তমার সম্পদের যাকাত দাও, নির্দেশ সমূহ মানো, তমার রবের জান্নাতে প্রবেশ কর। অর্থাৎ যারা নামাজ আদায় করে, রোজা রাখে, তাদের সম্পদের যাকাত দেয় এবং তাদের উপর আল্লাহ্ তা'য়ালা এবং তার খালিফাদের নির্দেশ মেনে চলে পৃথিবীতে, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন।এই হাদিস শারিফটি উল্লেখ করেছেন ইমাম আহমেদ এবং তিরমুষি।
৯.আসহাবে কিরামদের মধ্যে বিখ্যাত বুরাইদা-ই আসলামি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “ তোমাদের সাথে আমার সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো নামাজ। নামাজ ত্যাগকারী ব্যাক্তি কাফিরে পরিণত হয়”। এই হাদিস থেকে নামাজ আদায়কারী ব্যাক্তির মুসলমান হওয়ার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়। আরো বোঝা যায়, যে ব্যাক্তি নামাজকে গুরুত্ব দেয় না,অবশ্য পালনীয় কর্তব্যের তালিকায় প্রথমে স্থান দেয় না,নামাজকে ফরজ হিসেবে গ্রহন করে না এবং এ কারণে আদায় করে না সে কাফির হয়ে যায়। ইমাম আহমদ,তিরমিজি, নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ উপরোক্ত হাদিস শরীফটি নিজ নিজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
১০- আবু যর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন : “শরতের দিনে, রাসুলুল্লাহর সাথে ঘুরছিলাম” পাতা ঝরে পড়ছিল। তিনি দুটি ডাল ভাঙলেন আকস্মিক। তিনি বললেন, ও আবু যার, যখন কোন বাক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য ইবাদাত করে, তখন তার পাপ সমূহ এভাবে পাতা ঝরার মত করে ঝরে পড়ে। ইমাম আহমেদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই হাদিসটি উল্লেখ করেন।
১১. যাইদ বিন খালিদ জুহানি থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “কোন মুসলমান ব্যাক্তি যদি সহীহ-শুদ্ধভাবে বিনয় সহকারে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তবে তার পূর্বেকার গুনাহসমূহ করে দেয়া হয়”। অর্থাৎ মহান আল্লাহ তায়ালা তার সমস্ত সগীরা গুনাহ মাফ করে দেন। এই হাদিস শরীফটি ইমাম আহমদের কিতাবে বর্নিত আছে।
১২. আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনে আস্ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে“ কোন ব্যাক্তি নামাজ আদায় করলে ঐ নামাজ কিয়ামতের দিনে নূর (আলো)ও বুরহান (দলিল)এ পরিণত হবে এবং তার জাহান্নাম থেকে মুক্তির উছিলা হবে। আর নামাজকে মুহাফাজা (সংরক্ষণ;না করলে তা নূর ও বুরহানে পরিণত হবে না এবং সে নাজাত পাবে না। কারুন,ফেরাউন,হামান ও উবেই বিন খালাফ এর সাথে জাহান্নামে অবস্থান করবে”।
দেখা যাচ্ছে যে, কোন ব্যাক্তি যদি ফরজ ওয়াজিব, সুন্নাত ও মুস্তাহাব সহ যথাযথভাবে নামাজ আদায় করে তবে এই নামাজ কিয়ামতের সময়ে তার জন্য নূর হয়ে সঙ্গ দিবে। আর যথাযথভাবে নামাজ আদায় না করলে, নামাজকে মুহাফাজা না করলে কিয়ামতের দিবসে কাফিরদের সাথে একত্রে থাকতে হবে। অর্থাৎ তাদের সাথে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। উবেই বিন খালাফ মক্কার কুখ্যাত কাফিরদের অন্যতম ছিল। উহুদের যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের মুবারক হাত দ্বারা তাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন। উপরোক্ত হাদিস শরীফটি ইমাম আহমদ ও দারিমী নিজ নিজ কিতাবে বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম বায়হাকী তার শুয়াবুল ঈমান নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিরমিজি শরীফে বর্নিত আছে যে, প্রসিদ্ধ তাবেয়ীদের অন্যতম আবদুল্লাহ বিন শাকিক বলেছেন, “ সম্মানিত সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম, ইবাদতসমূহের মধ্যে শুধুমাত্র নামাজ ত্যাগ করাকে কুফর হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন”। আবদুল্লাহ বিন শাকিক হযরত উমর, হযরত আলী,হযরত উসমান এবং হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে হাদিস শরীফ বর্ণনা করেছেন। তিনি হিজরী একশত আট সালে ইন্তিকাল করেছেন।
১৩- তাবেঈনদের মধ্যে অন্যতম আব্দুল্লাহ বিন শাফিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন: “ আসহাবে কেরাম রা২দিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ইবাদাতের মধ্যে শুধু নামাজ বাদ দিলেই অবিশ্বাসী হয়ে যায়৷” তিরমুজি এমনটি উল্লেখ করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন শাফিক হাদিসটি সংগ্রহ করেছেন উমড়, আলী, উসমান এবং আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে। তিনি ১০৮ হিজরি সনে মারা যান।
১৪. হযরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাকে যদি টুকরো টুকরো করে কেটেও ফেলা হয় কিংবা আগুন দিয়ে পোড়ানোও হয় তবুও মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে কাউকে শরীক করিও না। ফরজ নামাজ কখনো ত্যাগ করিও না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজ ত্যাগ করে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। মদ পান করিও না ৷ কেননা মদ সকল অনিষ্টের চাবি’। এই হাদিস শরীফটি ইবনি মাযাহ এর গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এখানে দেখা যাচ্ছে যে, কেউ যদি ফরজ নামাজসমূহ অবজ্ঞাভরে ত্যাগ করে তবে সে কাফির হয়ে যায়। যদি আলসেমির কারণে ত্যাগ করে থাকে তবে সে কাফির না হলেও বড় গুনাহ সম্পন্নকারী হয়। তবে শরীয়তে যে পাঁচটি অবস্থাতে ফরজ নামাজ আদায়ের দায়ভার থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে সে অবস্থার কারণে আদায় না করলে গুনাহ হবে না। মদ ও অ্যালকোহলো জাতীয় পানীয় মানুষকে মাতাল করে, তার বিচারবুদ্ধি লোপ করে। আর বিচার বুদ্ধিহীন ব্যাক্তি সবধরনের পাপকাজ করতে সক্ষম৷
১৫- আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ( হে আলী! তিনটি কাজে কখনো দেরি করো না, যখন নামাজের সময় আসে সাথে সাথে তা আদায় করো। যখন মৃতের কবরের প্রস্তুতি শেষ হয় সাথে সাথে জানাজার নামাজ আদায় করো। যখন কোন মেয়ে কে কুওফের সাথে পাও, সাথে সাথে তাকে তার সাথে বিবাহ দিয়ে দাও।) ইমাম তিরমিজি রাহিমাহুল্লাহু তায়ালা হাদিসটি উল্লেখ করেছেন। [যেহেতু কোন একজন মেয়ে কে বিয়ে করা প্রয়োজন, একজন নারীকে তার কওফ বা তার জন্য নির্ধারিত বাক্তির সাথে । কওফের অর্থ ধনি নয়, বা অনেক সম্পদের মালিক নয়। এর অর্থ একজন সাহিহ মুসলিম, যে কিনা আহলে সুন্নাহর অনুসারী, নামাজ আদায় করে, নেশা করে না, আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ মেনে চলে এবং জীবনধারণের জন্য অর্থ উপার্জন করে। যারা তাদের জামাইয়ের কাছে সম্পদের আশা করে, তারা তাদের মেয়েদেরকে সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দেয়। তারা তাদের মেয়েদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। একইভাবে মেয়েদের জন্যও নামাজ আদায় করতে হবে, অবশ্যই খোলা মাথা, হাতে এবং একা বাইরে যাবে না, এমনকি কোন না মাহরাম পুরুষের সাথেও না।]
১৬. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে, “নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে যারা নামাজ আদায় করে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আর যারা ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পূর্বে আদায় করে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দেন'। এই হাদিসটি তিরমিযী শরীফে বর্নিত আছে।
১৭. উম্মু ফারওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একদা কোন আমলটি সর্বোত্তম বলে জিজ্ঞাসা করা হলো। উত্তরে আল্লাহ্র রাসূল বললেন, সর্বোত্তম ইবাদত হলো ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে আদায় করা নামাজ'। এই হাদিসটি ইমাম আহমদ, তিরমিযী এবং আবু দাউদ (র:) নিজ নিজ হাদিসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। নামাজ এমনিতেই সর্বোত্তম ইবাদত। ওয়াক্ত হওয়ার সাথে সাথে যদি তা আদায় করা হয় তবে তা আরো উত্তম হয়। হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্নিত, তিনি বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জীবনে একাধিকবার ওয়াক্তের শেষে নামাজ আদায় করতে দেখিনি'। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবনে একবার শুধু নামাজকে ওয়াক্তের শেষে আদায় করেছিলেন।
১৮- আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমি দ্বিতীয়বার কোনদিন রাসুলুল্লাহকে নির্ধারিত সময়ের পড়ে নামাজ আদায় করতে দেখি নি ।
১৯- হযরত উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,“যে সকল আল্লাহ তায়ালার মুসলিম বান্দারা তাতাউ নামাজ বার রাকাত আদায় করে ফরজ নামাজের পরে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন। ” মুসলিম শারিফে এই হাদিসটির উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পড়ে যে নামাজ আদায় করতেন সুন্নাত হিসেবে সেগুলোই তাতাউ নামাজ, অন্যভাবে নফল নামাজ
২০- তাবেঈনদের মধ্যে অন্যতম আব্দুল্লাহ বিন শাকিক বলেছেন, আমি তাতাউ সম্পর্কে জানতে চেয়েছি আয়শা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার কাছে, যা রাসুলুল্লাহর নফল নামাজ। তিনি বলেছেন দুপুরের ফরজ নামাজের আগে চার রাকাত এবং পরে দুই রাকাত, বিকেলের এবং রাতের ফরজ নামাজের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ প্রত্যেকদিন সকালের ফরজের পূর্বে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। মুসলিম,আবু দাউদ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা এই হাদিসটি উল্লেখ করেছেন।
২১. হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নফল ইবাদতসমূহের মধ্যে ফজরের দুই রাকাত সুন্নতকে সবচেয়ে বেশি নিয়মিতভাবে পালন করেছেন। এই হাদিস শরীফটি বুখারী শারীফেও আছে, মুসলিম শরীফেও আছে। এই হাদিস শরীফ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজগুলির সাথে আদায়কৃত সুন্নত নামাজসমূহকে নফল নামাজ হিসেবে গণ্য করেছেন।
ইসলামের মহান আলেম, আল্লাহভক্তদের নেতা, দালালাত বিদায়াতপন্থী ও মাজহাব বিরোধীদের বিপক্ষে আহলে সুন্নাতের শক্তিমান রক্ষক, সত্য দ্বীনকে প্রচারের জন্য আল্লাহ্র পক্ষ থেকে দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত, বিদয়াতকে নির্মূলকারী বিখ্যাত মুজাহিদ, ইমাম-ই রব্বানী মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী আহমদ বিন আবদুল আহাদ ফারুকী সেরহিন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক রচিত ইসলামের ইতিহাসে নজিরবিহীন, ‘মাকতুবাত’ নামক গ্রন্থের উনত্রিশতম মাকতুবে (পত্রে) বলেছেন যে :
আল্লাহ তায়ালা যা কিছু অনুমোদন করেছেন তা ফরজ এবং নফল। ফরজ ইবাদাতের সাথে নফলের তুলনায় নফলের তেমন কোন গুরুত্ব নেই। নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ নামাজ আদায় করা এক হাজার বছর নফল আদায়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। সকল প্রকার নফল যেমন নামাজ রোজা যাকাত ফিকর সব একি রকম। অধিকিন্তু ফরজ নামাজের সময় এর সুন্নাত এবং আদাব সমূহ পালন করা নফলের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সকালের নামাজ জামাতে আদায়ের পর হযরত উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জামাতের দিকে তাকালেন, দেখলেন একজন সদস্য অনুপস্থিত, তিনি জিজ্ঞেস করলেন সে কোথায়? তার সাথীরা বললেন, “তিনি প্রত্যেক রাতে নফল ইবাদাত করেন। ধারণা করা যায় ঘুমের কারণেতিনি জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারেন নি।” আমিরুল মুমিনিন বললেন, “যদি সে সারা রাত ঘুমিয়ে সকালে জামাতে নামাজ আদায় করে তবে তা অধিক উত্তম।” মাকরুহ এবং নফল ইবাদাত সমূহ যিকির, তাফাক্কুর, মুরাকাবা বাদ দিয়ে ফরজ আদায় করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। হ্যাঁ যদি এগুলো একসাথে পালন করা যায় মাকরুহ না করে তবে তা অবশ্যই ফযিলতপূর্ণ। ফরজ ছাড়া এসবের কোনই মূল্য নেই। এই কারনে, জাকাতের জন্য একটি স্বর্ণ মুদ্রা দেয়া, নফল ইবাদাতের জন্য হাজার স্বর্ণ মুদ্রা খরচের চেয়ে উত্তম। যাকাতের মুদ্রা দেয়ার সময় এর আদবের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, যেমন যাকাত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে দেয়া নফল আদায়ের জন্য দানের চেয়ে উত্তম। এছাড়া, যারা মাঝরাতের পড়ে নফল নামাজ আদায় করতে চান, তারা অবশ্যই পূর্বের ক্বাযা নামাজ আদায় করবেন। আল্লাহ্ নির্দেশ সমূহকে বলা হয় ফরজ, তার নিষেধ সমূহকে বলা হয় হারাম। আমাদের রাসুলের নির্দেশ সমূহ সুন্নাত এবং তার নিষেধ সমূহ মাকরুহ৷ এই সব গুলোকেই একসাথে বলা হয় আহকামে ইসলামিয়্যা৷ ভালো চরিত্রের অধিকারী হওয়া এবং মানুষেকে সাহায্য করা ফরজ। যারা আহকামে ইসলামিয়্যার কোন একটি নিয়ম অমান্য করে বা বিশ্বাস না করে তবে সে কাফির, মুরতাদে পরিণত হবে। যারা এসবগুলোতেই বিশ্বাস করে তারা মুসলিম। যে সকল মুসলিম অলসতার কারণেইসলাম মেনে চলে না তারা ফাসিক। যেসকল ফাসিক ফরজ আদায় করে না এবং হারাম কাজ করে তারা জাহান্নামে যাবে। সেই ব্যাক্তির কোন কাজ এবং সুন্নাত কবুল হবে না। সেগুলোর জন্য কোন সওয়াব দেয়া হবে না। যদি কোন ব্যাক্তি যাকাত দেয়, একটি মাত্র মুদ্রা খরচ করে, তার মিলিয়ন মুদ্রা খরচে ভালো কাজে কোন ফায়দা নেই। কোন সওয়াব দেয়া হবে না মসজিদ, বিদ্যালয় কিংবা হাসপাতাল এবং চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনে । তারাবিহ নামাজের যে কোন একটি আদায় না করা হলে তার রাতের ইবাদাত কবুল করা হবে না। ফরজ এবং ওয়াজিব ছাড়া যে সকল ইবাদাত করা হয় সেগুলো সুন্নাত নয়তো নফল। সুন্নাত হচ্ছে নফল ইবাদাত। এই বর্ণনা অনুযায়ী যারা ক্বাযা নামাজ আদ্য করেন তারা এইসব সুন্নাতের ক্বাযা নামাজও আদায় করবেন একই সময়ে। ফরজ আদায় করা এবং হারাম থেকে দূরে থাকা, মিলিয়ন নফল আদায়ের চেয়ে উত্তম। যারা ফরজ আদায় করে না এবং হারাম কাজ করে তারা জাহান্নামে যাবে। তার নফল ইবাদাত তাকে রক্ষা করতে পারবে না। ইবাদাতে পরিবর্তন আনা বিদাত। ইবাদাতের সময় বিদাত করা হারাম এবং তা ইবাদাতকে বাতিল করে দেয়। ফাসিক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করা যাবে না, যেমন যাদের স্ত্রী কন্যারা পর্দা করে না, যারা বিদাত করে যেমন লাউড স্পীকার ব্যাবহার করে। তার প্রচারণা এবং মনগড়া ধর্মীয় কথা শোনা উচিত না। তার কিতাবসমূহ পড়া উচিত নয়। তার সাথে হাসিমুখে এবং ভদ্র ভাবে কথা বলা উচিত তিনি বন্ধু হউন অথবা শত্রু। কার সাথে তর্ক করা উচিত নয়। একটি হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে : (একজন মূর্খের সাথে তর্ক করো না)।
ইবাদাত হৃদয়ের বিশুদ্ধতা বৃদ্ধি করে। পাপ হৃদয়কে দূষিত করে ফেলে, তার হৃদয় পুলকিত [ফেয়য] হয় না। প্রত্যেকটি মুসলিমের ইমান, ফরজ, হারাম সম্পর্কে জানা উচিত। সেগুলো না জানা তার জন্য কোন ওজর হতে পারে না। এটি ঠিক এরকম, জানার পরেও বিশ্বাস না করা।
মাকতুবাত কিতাবটি ফার্সি ভাষায় লিখিত যার লেখক হযরত ইমামে রাব্বানি মুজাদ্দিদ-ই আলফে সানী আহমদ বিন আবদুল আহাদ ফারুকী সেরহিন্দী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি যিনি ভারতের সেরহিন্দী শহরে ১০৩৪ হিজরি, ১৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তার সমস্ত জীবনবৃত্তান্ত তুরকিশ কিতাব হাক সমুন ভেসিকালারি, সায়েদেত এবেদিয়্যা এবং আসহাবে কারিম এবং ফার্সি কিতাব আল বারিকা'র মধ্যে লেখা রয়েছে।
