আযান ও ইকামাত
আযান শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো অবগত করা,ঘোষনা দেয়া। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ,ক্বাজা নামাজ ও জুমার নামাজে খতীবের সামনে পুরুষদের আযান দেয়া সুন্নাতই মুয়াক্কাদা। মহিলাদের ক্ষেত্রে আযান ও ইকামাত দেয়া মাকরুহ। আযান, অন্যদেরকে ওয়াক্ত সম্পর্কে অবহিত করার জন্য উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে দেয়া হয়। আযান দেয়ার সময় দুই হাত তুলে একটি করে আঙ্গুল দুই কানের ছিদ্রে রাখা মুস্তাহাব। ইকামাত দেয়া আযান দেয়ার চেয়ে অধিক ফজিলতপূর্ণ। আযান ও ইকামাত উভয়ই কিবলার দিকে ফিরে দিতে হয়। আযান ও ইকামাত দেয়ার সময় অন্য কথা বলা যায় না,এমনকি সালামের জওয়াবও দেয়া যায় না।
আযান ও ইকামাত দেয়ার প্রেক্ষাপট
১.জনবসতি কিংবা জনশূন্য যে কোন স্থানেই হোক না কেন একাকী অথবা জামাতের সাথে ক্বাজা নামাজ আদায়ের সময়,পুরুষদের জন্য উঁচু স্বরে আযান ও ইকামাত দেয়া সুন্নাত। আযান শ্রবণকারী মানুষ,জিন,পাথর সবকিছুই কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দিবে। কয়েক ওয়াক্তের ক্বাজা নামাজ একত্রে আদায়কারী, প্রথমে আযান ও ইকামাত দিবে। পরবর্তী ক্বাজা আদায়ের সময় প্রত্যেকটির জন্য শুধুমাত্র ইকামাত দিবে। আযান না দিলেও চলবে।
২. বাসায় একাকী কিংবা জামাতের সাথে ওয়াক্তের নামাজ আদায়কারী, আযান ও ইকামাত দিবে না। কেননা, ঐ এলাকার মসজিদে দেয়া আযান ও ইকামাত বাসার জন্যও দেয়া হয়েছে বলে গণ্য হয়। তবে আযান ও ইকামাত দিলে তা উত্তম হবে। মহল্লায় অবস্থিত মসজিদ কিংবা যেখানের মুসল্লীরা নির্দিষ্ট,সেখানে ওয়াক্তের নামাজ জামাতের সাথে আদায়ের পরে কেউ একাকী নামাজ আদায় করার সময় আর আযান ও ইকামাত দিবে না। তবে পথের পাশে অবস্থিত অথবা ইমাম-মুয়াজ্জিন ও মুসল্লী নির্দিষ্ট নয় এমন মসজিদে, বিভিন্ন সময়ে আগত মুসল্লীগণ একই ওয়াক্তের নামাজের জন্যই ভিন্ন ভিন্ন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে থাকে। এ ধরণের মসজিদে প্রত্যেক জামাতের জন্যই আলাদা আলাদাভাবে আযান ও ইকামাত দেয়া যায়। এখানে একাকী নামাজ আদায়কারী ব্যাক্তিও অল্প আওয়াজে নিজে শুনতে পায় এমন করে আযান ও ইকামাত দিতে পারে।
৩. মুসাফিররা নিজেদের মাঝে জামাতের সাথে কিংবা একাকী নামাজ আদায়ের সময় আযান ও ইকামাত দিবে। একাকী নামাজ আদায়কারীর সাথে সঙ্গীরা থাকলে আযান না দিলেও হবে। মুসাফির ব্যাক্তি একলা ঘরে নামাজ আদায়ের সময়ও আযান ও ইকামাত দিবে। কেননা ঐ এলাকার মসজিদে দেয়া আযান ও ইকামাত তার নামাজের জন্য বিবেচিত হবে না। মুসাফিরদের মধ্য থেকে কেউ ঘরে আযান দিলে পরবর্তীতে নামাজ আদায়কারী মুসাফিররা আর আযান না দিলেও হয়।
আকলওয়ালা বালক,অন্ধ,জারজ সন্তান, আযান দিতে জানে এমন জাহিলের আযান দেয়া জায়েজ। তা মাকরুহ নয়। অপবিত্র অবস্থায়, অজুহীন অবস্থায় অথবা বসে আযান দেয়া মাকরুহে তাহরিমী। একইভাবে মহিলা,ফাসিক,মাতাল ও আকলহীন বালকের আযান দেয়াও মাকরুহে তাহরিমী। এরা আযান দিয়ে থাকলে তা পুনরায় আদায় করতে হবে। আজানের সহীহ হওয়ার জন্য মুয়াজ্জিনকে অবশ্যই মুসলমান ও আকলওয়ালা হতে হবে। রেকর্ডকৃত আযানও সহীহ হবে না।
ফাসিক ব্যাক্তির আযান সহীহ না হওয়ার পিছনের কারণ হলো,ইবাদতের ক্ষেত্রে তার কথা বা বক্তব্য গ্রহণীয় না হওয়া। ফাসিকের আযানের দ্বারা নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায় না। এর আযানের কিংবা ইশারাতের দ্বারা রোজা ভাঙ্গা যায় না। আযানকে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শনকারী এবং এর হরফ ও কালিমাকে পরিবর্তন কিংবা বিকৃতি সাধন না করে,গানের মত সূর না দিয়ে,মিনারায় উঠে সুন্নাত অনুযায়ী পাঠকারী ব্যাক্তি সুউচ্চ মর্যাদা অর্জন করে।
আযানে মাইকের ব্যবহার
মিনারায় স্থাপন করা মাইকগুলি মুয়াজ্জিনের জন্য একধরণের অলসতার মাধ্যম হয়েছে। আযানকে অনেক ক্ষেত্রে ছোট কোন কক্ষে,অন্ধকারে সুন্নাত অনুযায়ী না দেয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা,আরশের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া আধ্যাত্মিকতায় সজ্জিত মিনারাগুলি এই মন্দ বিদায়াতের কারণে একএকটি মাইক বহনকারী খুটিতে পরিণত হয়েছে। ইসলামের আলেমগণ বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে সবসময়ই সাদরে গ্রহণ করেছে। যেমন, ছাপাখানা স্থাপনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন যেন উপকারী কিতাবসমূহ ছাপার মাধ্যমে জ্ঞানের প্রসার দ্রুত হয়। রেডিও ও মাইকের দ্বারাও সর্বত্র উপকারী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা যায়,যা নিঃসন্দেহে ইসলামের জন্য উপকারী ও পছন্দনীয় একটি আবিষ্কার। কিন্তু মুসলমানদেরকে আযানের সুমিষ্ট আওয়াজ থেকে বঞ্চিত করে, মাইকের প্রকম্পিত আওয়াজের ব্যবহার ক্ষতির কারণ হয়েছে। ঈমানপূর্ণ ক্বালবে ইলাহী প্রভাব বিস্তারকারী সালিহ মুমিনদের কন্ঠের বদলে যান্ত্রিক আওয়াজ দখল করেছে। মাইকের আবিষ্কারের আগে,মিনারা থেকে দেয়া আযান ও মসজিদের তাক্ববীর ধ্বনি বিধর্মীদেরকেও প্রভাবিত করত। প্রত্যেক মহল্লায় পঠিত আযান শুনে মসজিদকে পূর্ণকারী মুসল্লীগণ, আসহাবে কিরামদের জামানার মত নিজেদের নামাজকে খুশু’এর সাথে আদায় করত। আযানে নিহিত মুমিনদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী ইলাহী প্রভাব মাইকের যান্ত্রিকতায় বিলুপ্ত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিস শরীফে বলেছেন যে“কেউ আযানের আওয়াজ শুনে মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে তা আস্তে আস্তে বললে,প্রত্যেক অক্ষরের জন্য হাজার সওয়াব দেয়া হয় এবং তার হাজারটা গুনাহ মাফ করা হয়”।
আযান শ্রবণকারী ব্যাক্তি, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা অবস্থায় হলেও, মুয়াজ্জিনের সাথে আযানের বাক্যগুলি বলা সুন্নাত। যখন ‘হাইয়া আলা’ বাক্যগুলি শুনবে তখন তার পুনরাবৃতি না করে ‘লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বলবে। আযান শেষ হলে দুরুদ পড়বে,তারপর আযানের দোয়া পড়বে। দ্বিতীয় ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ' বলার সময়ে দুই বৃদ্ধাঙ্গুলের নখে চুমু দিয়ে দুই চোখের উপর বুলিয়ে দেয়া মুস্তাহাব। ইকামাতের সময় এরূপ করা যায় না।
আযানের বাক্যসমূহ
আল্লাহু আকবার--৪বার।
আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -২বার।
আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ- -২বার।
হাইয়া আলাস্ সালাহ -- -২বার।
হাইয়া আলাল ফালাহ -- ২বার।
আল্লাহু আকবার- ২বার।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ -- -১বার।
শুধুমাত্র ফজরের আযানের সময় ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’এর পরে দুইবার ‘আস্-সালাতু খাইরুন মিনান্-নাউম' বলতে হয়।
আর ইকামাতের সময়, ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’এর পরে দুইবার ‘ক্বাদ ক্বামাতিস্-সালাত' বলতে হয়৷
আযানের দোয়া:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে: "আযান দেয়ার সময় এই দোয়াটি পড়: “আনা আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ও আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ও রাসূলুহু, ওয়া রাদিতু বিল্লাহি রাব্বান ওয়া বিল ইসলামি দ্বীনান ওয়া বি মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা রাসূলান নাবিয়্যা”।
অপর একটি হাদিস শরীফে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন যে, “এই আমার উম্মত! আযান শেষ হলে এই দোয়াটি করি : আল্লাহুম্মা রাব্বা হাজিহিদ্ দাওয়াতিত্ তাম্মাতি, ওয়াস সালাতিল ক্বায়িমাতি, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদ্বিলাতা, ওয়াদ্ দারাজাতার্ রাফিয়াতা, ওয়াবয়াসহু মাকামাম্ মাহমুদানি লাজি ওয়াতাহু, ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিয়াদ”
আযানের অর্থ
আল্লাহু আকবার আল্লাহ্ তায়ালা মহান। তার জন্য কিছুই আবশ্যক নয়। বান্দার ইবাদতের প্রতিও তিনি মুখাপেক্ষী নন। তার জন্য বান্দার ইবাদতের কোন উপকারিতা নাই। এই গভীর অর্থকে মস্তিষ্কে উত্তমরূপে স্থাপন করার জন্য এই বাক্যটি চার বার বলা হয় ।
আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তার বড়ত্ব ও মহত্বের কারণে তিনি যেমন কারো ইবাদতের মুখপেক্ষী নন একইভাবে তিনি ব্যাতীত আর কারো ইবাদত পাওয়ার অধিকারও নাই এই সাক্ষ্য দিচ্ছি ও মনে প্রাণে বিশ্বাস করছি। কোন কিছুই তার তুলনা নয়৷
আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার প্রেরিত পয়গম্বর ও তার পছন্দনীয় ইবাদতের পদ্ধতি মানবজাতিকে শিক্ষাদানকারী হিসেবে মেনে নিলাম। আর মহান আল্লাহ্ তায়ালা রাসূলের মাধ্যমে যেই ইবাদতের শিক্ষা দিয়েছেন তার জন্য শুধুমাত্র ওই ইবাদতগুলিই উপযুক্ত তাও বিশ্বাস করি।
হাইয়া আলাস্ সালাত,হাইয়া আলাল ফালাহ এর দ্বারা মুমিনদের জন্য মুক্তি সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জনের মাধ্যম এই নামাজের প্রতি আহ্বান করা হয়। আল্লাহু আকবার তার উপযুক্ত কোন ইবাদত কারো পক্ষে করা সম্ভব নয়। তার জন্য যতই ইবাদত করা হোক না কেন, এগুলোর চেয়ে তিনি অনেক উর্দ্ধে, অনেক মহান।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ইবাদত পাওয়ার, সম্মানে মাথা ঝুকাবার অধিকারী একমাত্র তিনি তার উপযোগী কোন ইবাদত কারো পক্ষে করা যেমনিভাবে সম্ভব নয় একইভাবে তিনি ব্যাতীত কারো ইবাদত পাওয়ারও নূন্যতম অধিকারও নাই।
নামাজের মর্যাদা ও মহানত্ব, এর ব্যাপারে সবার প্রতি খবর দেয়ার জন্য বাছাইকৃত এই বাক্যগুলির অর্থের গভীরতা ও বড়ত্ব থেকেও প্রতীয়মান হয়
নিয়্যাত
ইফতিতাহ তাকবীর বলার সময়ে নিয়্যাত করতে হয়। নামাজের জন্য নিয়্যাত বলতে নামাজের নাম,ওয়াক্ত,কিবলা ও ইমামের অনুসরণের বিষয়গুলি মনেমনে স্থির করা বুঝায়।
ইফতিতাহ তাকবীরের পরে নিয়্যাত করলে তা শুদ্ধ হবে না,তাই নামাজও কবুল হয় না। ফরজ ও ওয়াজিব নামাজের নিয়্যাতের সময় কোন ফরজ বা ওয়াজিব তা জানা আবশ্যক। তবে রাকাতের সংখ্যা নিয়্যাত না করলেও চলবে।
সুন্নাতের ক্ষেত্রে শুধু নামাজের জন্য নিয়্যাত করাও যথেষ্ঠ। জানাজার নামাজের জন্য,আল্লাহ্র জন্য নামাজ ও মাইয়িতের জন্য দোয়ার নিয়্যাত করলাম, বলা যথেষ্ঠ৷ ইমামের জন্য পুরুষ জামাতের ঈমাম হিসেবে নিয়্যাত না করলেও চলবে। তবে উপস্থিত জামাতের ইমাম হিসেবে নামাজ আদায় করছি বলে নিয়্যাত না করলে,জামাতে নামাজ আদায়ের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। ইমামের নিয়্যাত করলে, জামাতের সওয়াব অর্জন করবে। তবে জামাতে মহিলাদের উপস্থিতি থাকলে,মহিলাদের ইমাম হিসেবে নিয়্যাত করা আবশ্যক৷
ইবাদত করার সময়, শুধুমাত্র মুখ দিয়ে উল্লেখ করাকে নিয়্যাত বলে না। ক্বালবের দ্বারা নিয়্যাত না করলে,ইবাদত কবুল হয় না।
তাকবীরে তাহরীমা:
নামাজে দাঁড়ানোর সময় ‘আল্লাহু আকবার' বলে শুরু করা ফরজ। এর বদলে অন্য শব্দ বললে হবে না। কিছু আলেম তাকবীরে তাহরীমাকে নামাজের অন্তর্গত ফরজ হিসেবে গণ্য করেছেন। তাদের মতে নামাজের শর্ত ও রুকন উভয়ই ছয়টি।
নামাজের রুকন সমূহ
নামাজের ভিতরের ফরজগুলিকে রুকন বলা হয়। এগুলো পাঁচটি
১. কিয়াম
নামাজের পাঁচটি রুকনের মধ্য থেকে প্রথমটি হলো কিয়াম। কিয়ামের অর্থ হলো, দাঁড়িয়ে থাকা। পায়ে দাঁড়াতে অক্ষম অসুস্থ ব্যাক্তি বসে নামাজ আদায় করবে। যদি অসুস্থতা এমন হয় যে,বসতেও অক্ষম,তবে চিত হয়ে শুয়ে মাথার দ্বারা নামাজ আদায় করবে। মুখমণ্ডল আকাশের দিকে নয়, কিবলার দিকে ফিরাবে। এর জন্য মাথার নিচে বালিশ ব্যবহার করতে পারে। পাগুলিকে খাঁড়া করে রাখবে,কিবলার দিকে ছড়িয়ে রাখবে না। যখন দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করবে তখন দুই পা পরস্পর থেকে চার আঙ্গুল পরিমান খালি রাখবে।
দাঁড়াতে অক্ষম ব্যক্তি কিংবা দাঁড়ালে মাথা ঘুরা,দাঁত চোখ কিংবা অন্য কিছুর ব্যাথা বৃদ্ধি পায়,সামনের বা পিছনের রাস্তা দিয়ে মূত্র কিংবা বাতাস বের হয়, ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়,শত্রুর আক্রমণের শঙ্কা বৃদ্ধি পায়,মাল চুরি হওয়ার সম্ভাবনা হয়, বমি হয় বা রোজা ভঙ্গ হয় অথবা লজ্জাস্থান অবমুক্ত হয় এমন ব্যক্তিগণ বসে নামাজ আদায় করবে। রুকুর জন্য সামান্য ঝুঁকবে,আর সিজদার জন্য মাথা জমিনে রাখবে। যদি মাথা জমিনে রাখতেও অক্ষম হয় তবে, রুকুর জন্য সামান্য আর সিজদার জন্য এর চেয়ে বেশী ঝুঁকাবে। যদি রুকুতে যতখানি মাথা ঝুঁকাবে তার চেয়ে সিজদাতে বেশী মাথা না ঝুঁকায় তবে নামাজ সহীহ হবে না। জমিনে পাথর অথবা কাঠ রেখে তার উপরে সিজদা করলে,নামাজ সহীহ হলেও গুনাহগার হবে। কেননা তা মাকরুহে তাহরিমী হয়।
২. কিরাত,
সুন্নাত ও বিতরের নামাজের প্রত্যেক রাকাতে এবং একাকী আদায় করার সময় ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে দাঁড়িয়ে পবিত্র কুরআন থেকে অন্ততপক্ষে একটি আয়াত তিলাওয়াত করা ফরজ। সংক্ষিপ্ত সূরা পড়লে আরো উত্তম হবে।
কিরাত হিসেবে এসব স্থানে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করা এবং সুন্নাত ও বিতর নামাজের প্রত্যেক রাকাতে এবং ফরজ নামাজের প্রথম দুই রাকাতে সূরা ফাতিহার পরে অন্য কোন সূরা,কিংবা তিন আয়াত তিলাওয়াত করা ওয়াজিব। সূরা ফাতিহা অন্য সূরার আগে তিলাওয়াত করাও ওয়াজিব। এই ওয়াজিবগুলি থেকে কোনটি ভুলে পালন না করলে এর জন্য সাহু সিজদা দিতে হবে।
কিরাত হিসেবে কুরআনই কারীমের তরজমা পড়লে তা জায়েজ হবে না। ইমামের জন্য জুমা ও ঈদের নামাজ ব্যাতীত প্রত্যেক নামাজের প্রথম রাকাতে, দ্বিতীয় রাকাতে যতটুকু পড়বে তার দ্বিগুণ পরিমাণ তিলাওয়াত করা সুন্নাত। একাকী নামাজ আদায়ের সময় প্রত্যেক রাকাতে সমপরিমাণ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারে। ইমামের জন্য একই ওয়াক্তের নামাজের একই রাকাতে একই আয়াত পড়ার অভ্যাস করা মাকরুহ। প্রথম রাকাতে তিলাওয়াতকৃত আয়াত বা সূরা দ্বিতীয় রাকাতেও পুনরায় তিলাওয়াত করা মাকরুহে তানজিহী। কুরআনের ধারাবাহিকতার বিপরীত তিলাওয়াত করা অধিকতর অপছন্দনীয়। প্রথম রাকাতে যেই সূরা পরা হয়,দ্বিতীয় রাকাতে তার পরবর্তী সূরা না পড়ে তার পরেরটি তিলাওয়াত করাও মাকরুহ। পবিত্র কুরআনের মুসহাফ হিসেবে যেভাবে আছে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তিলাওয়াত করা সবসময়ের জন্যই ওয়াজিব।
৩ রুকু
দাঁড়ানো অবস্থায় কিরাতের পরে তাকবীর বলে রুকুর জন্য ঝুকতে হয়। রুকুতে পুরুষগণ আঙ্গুলগুলিকে ফাঁকা ফাঁকা করে হাঁটুর উপরে রাখবে,পিঠ ও মাথাকে এক সমতলে রাখবে।
রুকুতে কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম' বলবে। তবে তিনবার না পরার আগেই যদি ইমাম মাথা তুলে ফেলে তবে মুসল্লীও মাথা তুলে ফেলবে। রুকুতে হাত ও পা সোজা করে রাখতে হয়। মহিলাগণ হাতের আঙ্গুলগুলি ফাঁকা করে রাখবে না। পিঠহা ও পা ও সোজা করে রাখবে না।
রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলা ইমাম কিংবা একাকী আদায়কারীর জন্য সুন্নাত। জামাতে নামাজের সময় মুসল্লীগণ তা বলবে না। বরং এর পরপরই ‘রব্বানা লাকাল হামদ' বলবে। সোজা হয়ে দাঁড়াবে পরে আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যাওয়ার সময়ে প্রথমে ডান ও পরে বাম হাঁটু তারপর ডান ও পরে বাম হাত, এরপর নাক ও কপাল জইনে রাখবে ।
৪. সিজদা
সিজদার সময় হাতের আঙ্গুলগুলি একত্রিত করে কিবলা অভিমুখে কান বরাবর জমিনে রাখবে, মাথা দুইহাতের মাঝে অবস্থান করবে। কপাল পবিত্র স্থানে তথা মাটি,পাথর,কাঠ,চাঁদর ইত্যাদির উপর রাখা ফরজ,একইসাথে নাকও জমিনে রাখা ওয়াজিব। উজর না থাকলে শুধুমাত্র নাক দিয়ে সিজদা করা জায়েজ নয়। শুধুমাত্র কপাল দিয়ে সিজদা করা মাকরুহ।
দুই পা অথবা কমপক্ষে প্রত্যেক পায়ের একটি করে আঙ্গুল জমিনে রাখা ফরজ,কারো মতে ওয়াজিব। অর্থাৎ দুই পা মাটিতে না রাখলে নামাজ কবুল হবে না অথবা মাকরুহ হবে।
সিজদার সময় পায়ের আঙ্গুলগুলিকে বাঁকা করে কিবলার দিকে ফিরানো সুন্নাত ।
সিজদার সময় পুরুষরা,হাত ও রানকে পেট থেকে আলাদা করে রাখবে। হাত ও হাঁটু মাটিতে রাখা সুন্নাত। পায়ের গোড়ালিদ্বয় দাঁড়ানোর সময় চার আঙ্গুল পরিমাণ ফাঁকা রাখা রুকু ও সিজদার সময় মিলিত রাখা সুন্নাত সিজদায় যাওয়ার সময় প্যান্টের নীচের অংশকে উপরে টানা মাকরুহ এগুলো কে বটে নামাজে দাঁড়ানোও মাকরুহ। জামার হাতা ও প্যান্টের অথবা পায়জামার নিম্নাংশকে বটে ছোট করে নামাজ আদায় করাও মাকরুহ। অলসতা করে কিংবা গুরুত্বের কথা না ভেবে মাথা অনাবৃত রেখে নামাজ আদায় করা মাকরুহ। নামাজকে গুরত্ব না দেয়া কুফুরীর শামিল। ময়লা পোশাক কিংবা কাজের পোশাক পরে নামাজ আদায় করাও মাকরুহ।
৫.শেষ বৈঠক:
শেষ রাকাতে ‘আত্তাহিয়্যাতু' পড়তে যতটুকু সময় লাগে ততটুকু সময় পর্যন্ত বসা ফরজ। বসার সময়ে হাতের আঙ্গুলের দ্বারা ইশারা করবে না। পুরুষরা বাম পাকে, আঙ্গুলগুলি যেন ডান দিকে ফিরে থাকে এমনকরে জমিনে রাখবে এর উপরে বসবে। ডান পাকে খাঁড়া করে রাখবে এর আঙ্গুলগুলি জমিনে লেগে থাকবে। আঙ্গুলের মাথাগুলি কিবলার দিকে যতটা সম্ভব ফিরিয়ে রাখবে। এভাবে বসা সুন্নাত ।
মহিলারা সরাসরি জমিনে বসবে রানদ্বয় মিলিয়ে রাখবে। ডান পা ডান দিক থেকে বাইরের দিকে রাখবে বাম পাকে আঙ্গুলগুলি ডান দিকে ফিরিয়ে তার নিচে রাখবে।
নামাজ আদায়ের পদ্ধতি একাকী আদায়কারী পুরুষের নামাজ
উদাহরণস্বরূপ ফজরের নামাজের সুন্নাত নিম্নরূপে আদায় করবে
১. প্রথমে কিবলার দিকে ফিরে দাঁড়াবে। দুই পায়ের মাঝে চার আঙ্গুল পরিমাণ খালি জায়গা রেখে সমান্তরালে রাখবে। দুই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে কানের লতি পর্যন্ত তুলে স্পর্শ করিয়ে হাতের তালু কিবলামুখী করে খোলা রেখে নিয়্যাত করবে। ‘আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কিবলামুখী হয়ে আজকের ফজরের সুন্নাত নামাজ আদায়ের জন্য নিয়্যাত করলাম' বলে মনে মনেও তা স্থির করার পর ‘আল্লাহু আকবার' বলে নাভির নিচে ডান হাত দিয়ে বাম হাতের উপরে রেখে বাঁধবে।
২ দৃষ্টি সর্বদা সিজদার স্থানের দিকে থাকবে। এ অবস্থায় প্রথমে ‘সুবহানাকা’ পড়বে এরপর ‘আউজুবিল্লাহ’‘বিসমিল্লাহ' পড়ে সূরা ফাতিহা পড়বে। ফাতিহার পরে ‘বিসমিল্লাহ্” না পরেই আরেকটি সূরা পাঠ করবে। উদাহরণস্বরূপ: ‘আলাম তারা কাইফা’ পাঠ করল।
(শাফিঈ মাজহাব অনুযায়ী সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরার মাঝে ‘বিসমিল্লাহ্” পাঠ করতে হয়
৩ সূরা পাঠ করার পরে ‘আল্লাহু আকবার' বলে রুকুর জন্য ঝুঁকবে। দুই হাত দুই হাটুর উপরে ছড়িয়ে রাখবে ও হাটু ধরে রাখবে। কোমর,পিঠ ও মাথা সমান্তরালে রাখবে। দৃষ্টি পা বরাবর থাকবে। এ অবস্থায় তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম' বলবে,চাইলে পাঁচ অথবা সাতবারও পড়তে পারে।
৪. এরপর ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ্” বলে দাঁড়াবে। এ অবস্থায় পায়জামা বা প্যান্টের নিচের অংশ নিয়ে টানাটানি করবে না এবং দৃষ্টি সিজদার স্থানে স্থির থাকবে। সম্পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পর ‘রব্বানা লাকাল হামদ বলবে। (এইসময়ের সোজা হয়ে দাঁড়ানোকে ‘কাওমা’ বলা হয়।
৫. বেশীক্ষণ এভাবে না থেকে ‘আল্লাহু আকবার' বলে সিজদায় যাবে। সিজদায় যাওয়ার সময় ধারাবাহিকভাবে নিম্নে বর্নিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে
ক ডান হাঁটু পরে বাম হাঁটু ডান হাত পরে বাম হাত নাক ও কপাল জমিনে রাখবে। খ) পায়ের আঙ্গুলগুলিকে কিবলার দিকে বাঁকাবে।
গ)মাথাকে দুই হাতের মাঝ বরাবর স্থাপন করবে।
ঘ)হাতের আঙ্গুলগুলিকে মিশিয়ে রাখবে।
ঙ)হাতের তালু জমিনের সাথে মিশিয়ে রাখবে।
চ) এই অবস্থায় থেকে কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা” বলবে।
৬. এরপর ‘আল্লাহু আকবার' বলে বাম পাকে জমিনে বিছিয়ে ডান পায়ের আঙ্গুলগুলিকে কিবলার দিকে ফিরিয়ে রানের উপরে বসবে। হাতের তালু হাটুর উপরের অংশে স্বাভাবিকভাবে রাখবে।
৭. এভাবে বেশিক্ষণ বসে না থেকে ‘আল্লাহু আকবার' বলে পুনরায় সিজদায় যাবে। দুই সিজদার মাঝের এই বসাকে ‘জালসা” বলা হয়।
৮. সিজদায় পুনরায় কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা” বলার পরে ‘আল্লাহু আকবার' বলে দাঁড়াবে। দাঁড়ানোর সময় হাত দিয়ে জমিনে ভর দিবে না এবং পা নাড়াচাড়া করবে না। সিজদা থেকে উঠার সময় প্রথমে কপাল, পরে নাক,এরপর বামহাত ও ডানহাত,তারপর বাম হাঁটু ও ডান হাঁটু জমিন থেকে উঠাবে।
৯. দাঁড়ানো অবস্থায় ‘বিসমিল্লাহ্” পড়ে সূরা ফাতিহা ও অন্য একটি সূরা মিলিয়ে পড়ার পরে ‘আল্লাহু আকবার” বলে আবার রুকুতে যাবে।
১০.দ্বিতীয় রাকাতও প্রথম রাকাতের বর্ণনা অনুযায়ী সম্পূর্ণ করবে। তবে, দ্বিতীয় সিজদার পর ‘আল্লাহু আকবার” বলে দাঁড়িয়ে না গিয়ে রানের উপরে বসবে এবং ‘আত্তাহিয়্যাতু’,‘আল্লাহুম্মা সাল্লি’‘আল্লাহুম্মা বারিক’ ও ‘রব্বানা আতিনা’ দোয়াসমূহ পাঠ করার পরে প্রথমে ডান দিকে ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ' পরে বাম দিকে ‘আসসালামু আলাইকুম' বলে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবে।
সালাম ফিরানোর পরে, ‘আল্লাহুম্মা আনতাস্ সালাম ওয়া মিনকাস্ সালাম,তাবারকতা ইয়া জাল-জালালি ওয়াল ইকরাম' দোয়াটি পড়বে এবং কোন কথা না বলে ফজরের নামাজের ফরজ আদায়ের জন্য দাঁড়াবে। সুন্নাত ও ফরজ নামাজের মাঝে কথা বললে বহু সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। নামাজের পরে, সম্পূর্ণ ইসতিগফার দোয়াটি তিন বার পাঠ করবে। এরপর ‘আয়াতুল কুরসী' ও তেত্রিশবার ‘সুবহানাল্লাহ’, তেত্রিশবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’, তেত্রিশবার ‘আল্লাহু আকবার' এবং একবার ‘তাহলিল” অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির' পড়বে। (এই দোয়াগুলি নিচুস্বরে পরবে।
এরপর দোয়া করবে। দোয়ার সময় পুরুষগণ তাদের হাতকে বুক বরাবর তুলবে ও কনুইর থেকে ভাঙবে না। হাতের তালু খোলা রাখবে ও আসমানের দিকে ফিরিয়ে রাখবে। কেননা, নামাজের জন্য যেমন কা'বা শরীফ কিবলা, ঠিক একইভাবে দোয়ার জন্য কিবলা হলো আসমান। দোয়ার পরে প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদাভাবে ‘বিসমিল্লাহ্” সহ এগারবার সূরা ইখলাস্,দুই ‘ক্বুল আউজু’ সূরা, এবং সাতষট্টিবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা মুস্তাহাব। এরপর ‘সুবহানা রব্বিকা রব্বিল ইজ্জাতি' আয়াতটি পাঠ করে হাতগুলি মুখমণ্ডলে মুছবে।
চার রাকাত বিশিষ্ট সুন্নাত ও ফরজ নামাজের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় রাকাতের পরে ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পরে দাঁড়িয়ে যাবে। সুন্নাত নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে সূরা ফাতিহার পরে অন্য একটি সূরা মিলাতে হয়। কিন্তু ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধুমাত্র সূরা ফাতিহা পড়তে হয় অন্য কোন সূরা মিলাতে হয় না। মাগরিবের ফরজের ক্ষেত্রেও একইভাবে তৃতীয় রাকাতে সূরা মিলাতে হয় না।
বিতর নামাজের তিন রাকাতের প্রতিটিতেই সূরা ফাতিহার পরে সূরা মিলাতে হয়। তৃতীয় রাকাতে সূরা মিলানোর পরে ‘আল্লাহু আকবার' বলে হাতগুলি কানের লতি পর্যন্ত তুলে আবার নাভির নিচে বেঁধে দোয়া-ই কুনুত পাঠ করতে হয়। আছর ও এশার ফরজ নামাজের পূর্বে যে ‘সুন্নাত-ই গায়রি মুয়াক্কাদা' রয়েছে তা অন্যান্য চার রাকাত বিশিষ্ট সুন্নাতের মতই আদায় করতে হয়। তবে দ্বিতীয় রাকাতের পরে বসা অবস্থায় ‘আত্তাহিয়্যাতু’ এর পরে ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি’ ও ‘আল্লাহুম্মা বারিক’ দুরুদ শরীফ পড়তে হয়।
একাকী আদায়কারী মহিলার নামাজ
উদাহরণস্বরূপ ফজরের নামাজের সুন্নাত নিম্নরূপে আদায় করবে
দেহের গড়ন ও ভাঁজ প্রকাশ পাবে না, এমনভাবে মাথা থেকে পা পর্যন্ত আবৃত করবে। শুধুমাত্র হাত ও মুখমণ্ডল খোলা থাকবে। নামাজে পঠিত ক্বিরাত ও দোয়া, উপরে বর্নিত একাকী আদায়কারী পুরুষের নামাজের মতই। যেসব বিষয়ে পার্থক্য আছে তা নিম্নরূপ
ক তাকবীরের সময় হাতগুলিকে পুরুষদের মত কান পর্যন্ত তুলবে না। কাঁধ বরাবর তুলে নিয়্যাত করে তাকবীর দিবে। এরপর বুকের উপরে হাত রেখে নামাজ
শুরু করবে।
খ রুকুতে পিঠ পুরোপুরি সোজা করবে না।
গ.সিজদার সময় হাতের কনুই জমিনে রাখবে।
ঘ.তাশাহহুদ পড়ার সময় রানের উপরে বসবে অর্থাৎ ডান ও বাম পা ডান দিকে ছড়িয়ে বাম রানের উপর বসবে।
নামাজে মহিলাদের জন্য উত্তমরূপে পর্দা করার সহজ উপায় হলো,হাত সহ সমস্ত শরীর আবৃত করতে পারবে এমন দীর্ঘ ওড়না এবং পা পর্যন্ত ঢেকে রাখবে এমন ঢোলা ও লম্বা পোশাক পরিধান করা।
নামাজের ওয়াজিবসমূহ
নামাজের ওয়াজিবসমূহ নিম্নরূপ
১. সূরা ফাতিহা পাঠ করা।
২. সূরা ফাতিহার পর একটি সূরা অথবা কমপক্ষে সংক্ষিপ্ত তিন আয়াত
তিলাওয়াত করা।
৩. এক্ষেত্রে প্রথমে সূরা ফাতিহা পড়া তারপর অন্য সূরা পড়া।
৪. সূরা ফাতিহা ও এর সাথে মিলিয়ে অন্য সূরা ফরজ নামাজের প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতে আর ওয়াজিব ও সুন্নাত নামাজের প্রত্যেক রাকাতে পড়া।
৫.সিজদা সবসময় একসাথে দুইটি করে আদায় করা।
৬.তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের দ্বিতীয় রাকাতের পরে তাশাহহুদ পরিমাণ বসা। শেষ বৈঠকে বসা ফরজ।
৭.দ্বিতীয় রাকাতের পর তাশাহহুদের চেয়ে অতিরিক্ত সময় না বসা।
৮.সিজদায় নাক কপালের সাথে একত্রে জমিনে রাখা।
৯.শেষ বৈঠকে বসার সময়ে ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পাঠ করা।
১০ নামজের মাঝে তা’দিলই এরকান বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
১১.সর্বশেষে আসসালামু আলাইকুম বলে নামাজের সমাপ্ত করা।
১২.বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতের শেষে দোয়াই কুনুত পড়া
১৩.ঈদের নামাজের অতিরিক্ত তাকবীর দেয়া।
১৪. ইমামের জন্য ফজর,জুমা,ঈদ,তারাবীহ ও বিতর নামাজের সব রাকাতে এবং মাগরিব ও এশার নামাজের প্রথম দুই রাকাতে কিরাত আওয়াজ করে পড়া। ১৫.ইমামের ও একাকী আদায়কারী মুসল্লীর জন্য যোহর ও আছরের ফরজ নামাজে মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে এবং এশার ফরজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে নীচুস্বরে কিরাত পড়া। উপরে বর্নিত যেসব স্থানে ইমামের জন্য আওয়াজ করে কিরাত পড়া ওয়াজিব সেসব স্থানে একাকী নামাজ আদায়কারী মুসল্লীর জন্য উচুস্বরে কিংবা নীচুস্বরে কিরাত তিলাওয়াত করা উভয়ই জায়েজ।
কুরবানীর ঈদে আরাফাতের দিন ফজরের নামাজ থেকে চতুর্থ দিনের আছরের নামাজ পর্যন্ত তেইশটি ফরজ নামাজ আদায়ের পরে ‘তাশরিক তাকবীর' আদায় করা ওয়াজিব।
সাহু সিজদা
নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি, নামাজের ফরজগুলি থেকে কোন একটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ভুলে ত্যাগ করলে নামাজ ভঙ্গ হয়। তবে যদি কোন একটি ওয়াজিব ভুলে আদায় না করলে নামাজ নষ্ট হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে তাকে সাহ সিজদা আদায় করতে হবে। সাহু সিজদাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে অথবা নামাজের ওয়াজিবগুলি থেকে কোন একটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্যাগ করলে মুসল্লীর উপর ঐ নামাজ পুনরায় আদায় করা ওয়াজিব হয়। তা আদায় না করলে গুনাহগার হবে। নামাজের সুন্নাত আমলের মধ্য থেকে কোন একটি আদায় না করলে সাহু সিজদা দিতে হয় না। সাহু সিজদা মূলত নামাজের কোন ফরজকে বিলম্বিত করার জন্য অথবা ওয়াজিবের বিলম্ব কিংবা ত্যাগের জন্য আদায় করতে
হয়৷
একই নামাজের মধ্যে একাধিকবার সাহু সিজদা ওয়াজিব হলেও, একবার আদায় করাই যথেষ্ঠ। জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের ওয়াজিবের ক্ষেত্রে ভুল হলে তার অনুসরণকারী মুসল্লীদেরও তার সাথে সাসিজদা আদায় করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে মুসল্লীর ভুলের কারণে সাহু সিজদা ওয়াজিব হলেও জামাত থেকে আলাদাভাবে তার সাহু সিজদা আদায় করতে হবে না।
সাহু সিজদা আদায়ের জন্য শেষ বৈঠকে ‘তাহাইয়্যাত’ পড়ার পরে ডান দিকে সালাম ফিরানোর পরে দুইবার সিজদা করে বসবে এবং ‘তাহিয়্যাত’, ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি ও বারিক’ ও ‘রাব্বানা’ দোয়াসমূহ পড়ে নামজ শেষ করবে। এক বা দুইদিকেই সালাম ফিরিয়ে কিংবা কোনদিকেই সালাম না ফিরিয়েও সাহু সিজদা আদায় করা যায় ।
সাহু সিজদা ওয়াজিব হওয়ার কারণ:
যেখানে বসতে হবে সেখানে না বসে দাঁড়িয়ে গেলে কিংবা দাঁড়াতে হবে এমন জায়গায় বসে গেলে, আওয়াজ করে কিরাত পড়তে হবে এমন জায়গায় নীচুস্বরে কিংবা নীচুস্বরে পড়তে হবে এমন জায়গায় আওয়াজ করে কিরাত পড়লে, দোয়া পড়ার জায়গায় কিরাত পড়লে কিংবা কিরাত পড়ার জায়গায় দোয়া পড়লে সাহু সিজদা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ,সূরা ফাতিহার জায়গায় আত্তাহিয়্যাতু পড়লে কিংবা আত্তাহিয়্যাতু পড়ার জায়গায় সূরা ফাতিহা পাঠ করা। নামাজ সম্পূর্ণ শেষ না করে সালাম ফিরালে,ফরজ নামাজের প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা না মিলিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে পাঠ করলে কিংবা সূরা ফাতিহার পরে কোন কিরাত না পড়লেও সাহু সিজদা দিতে হবে। এছাড়াও ঈদের নামাজের বিশেষ তাকবীর না দিলে কিংবা বিতর নামাজে দোয়া-ই কুনুত না পড়লেও সা সিজদা দিতে হবে।
তিলাওয়াত.ই সিজদা
পবিত্র কুরআনের চৌদ্দটি স্থানে সিজদার আয়াত রয়েছে। এগুলো র থেকে যে কোন একটি আয়াত তিলাওয়াত করলে কিংবা শুনলে, এর অর্থ না বুঝলেও একবার সিজদা করা ওয়াজিব হবে। তবে সিজদার আয়াত লিখলে কিংবা ছাপার জন্য সাঁজালে তার সিজদা করতে হবে না।
পর্বত মরুভূমি কিংবা অন্যকিছু থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুনরায় ফিরে আসা সিজদা আয়াতের আওয়াজ শ্রবণকারীর কিংবা পাখির মুখ থেকে ঐ আয়াতগুলি শ্রবণকারী ব্যক্তির উপর সিজদা করা ওয়াজিব হবে না। মানুষের কন্ঠ থেকে শুনা জরুরী। রেডিও মাইক ইত্যাদি থেকে শুনা আওয়াজ,মানুষের কন্ঠ না হওয়ায় বরং হাফিজের স্বরের অনুরূপ প্রাণহীন যন্ত্রের আওয়াজ হওয়ায় এসব যন্ত্রের থেকে শুনা সিজদার আয়াতের জন্য সিজদা করা ওয়াজিব নয়।
তিলাওয়াত.ই সিজদা আদায়ের জন্য অজু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কান পর্যন্ত হাত না তুলে ‘আল্লাহু আকবার' বলে সিজদায় জেতে হবে। সিজদায় কমপক্ষে তিনবার ‘সুবহানা রব্বিয়াল আলা' বলতে হবে। এরপর ‘আল্লাহু আকবার' বলে সিজদা থেকে উঠার মাধ্যমে তিলাওয়াত ই সিজদা আদায় করা হয়ে যায়। তবে সিজদা দেয়ার পূর্বে এর জন্য নিয়্যাত করা শর্ত। নিয়্যাত না করে সিজদা দিলে তা তিলাওয়াত.ই সিজদা হিসেবে কবুল হবে না।
নামাজের মধ্যে সিজদার আয়াত পাঠ করলে সাথেসাথে রুকুতে-সিজদাতে যাবে অথবা একটি সিজদা আদায় করে দাঁড়িয়ে ক্বিরাত পড়া চালিয়ে যেতে পারে। সিজদা আয়াত পাঠ করার পরে আরো দুই-তিন আয়াত তিলাওয়াত করে রুকুতে গেলে এবং তিলাওয়াত-ই সিজদার নিয়্যাত করলে, নামাজের রুকু ও সিজদাসমূহ তিলাওয়াত.ই সিজদা হিসেবে কবুল হবে আলাদাভাবে সিজদার প্রয়োজন নাই। জামাতের সাথে আদায়কারী ব্যক্তি ইমামের সিজদা আয়াতের তিলাওয়াত করার সময় শুনুক বা না শুনুক,ইমামের সাথে সিজদাই তিলাওয়াতের নিয়্যাতে রুকু ও দুই সিজদা করবে। রুকুতে যাওয়ার সময় তিলাওয়াত ই সিজদার জন্য জামাতেরও নিয়্যাত করা আবশ্যক। নামাজের বাইরে সিজদার আয়াত পাঠ করলে সাথেসাথে না করে সুবিধাজনক সময়েও তিলাওয়াতই সিজদা আদায় করতে পারে। শুকুর সিজদা.
তিলাওয়াত-ই সিজদার মত আদায় করতে হয়। আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত প্রাপ্ত হলে কিংবা কোন বালা-মুসীবত থেকে মুক্তি পেলে,বান্দার উপর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য শুকুর সিজদা করা মুস্তাহাব। শুধুমাত্র সিজদায় প্রথমে ‘আলহামদু লিল্লাহ' বলবে পরে সিজদার তাসবীহ পরবে। নামাজ শেষ হওয়ার পরপর সিজদা করা মাকরুহ।
বুজুর্গগণ বলেছেন নামাজকে যথাযথভাবে অর্থাৎ ‘তা’দিল-ই আরকান’সহ আদায় না করলে ব্যক্তি নিজের সাথেসাথে অন্যান্য মাখলুককেও ক্ষতির সম্মুখীন করে। কেননা ঐ ব্যক্তির গুনাহের কারণে অনাবৃষ্টি কিংবা অতিবৃষ্টি হয় ফসল ফলায় না,অসময়ে বৃষ্টি হয়,যা উপকারের বদলে ক্ষতির কারণ হয়।
নামাজের সুন্নাতসমূহ
১. নামাজ শুরুর সময় কান পর্যন্ত হাত তোলা।
২. এসময় হাতের তালু কিবলার দিকে ফিরানো।
৩. তাকবীরের পর হাত বাঁধা।
৪.ডান হাত বাম হাতের উপর স্থাপন করা
৫. পুরুষের জন্য নাভির নিচে আর মহিলাদের জন্য বুকের উপর হাত বাঁধা।
৬ ইফতিতাহ তাকবীরের পরে ‘সুবহানাকা’ পড়া।
৭.ইমাম ও একাকী নামাজ আদায়কারী ব্যক্তির ‘আউজুবিল্লাহ’ পড়া৷ ৮.‘বিসমিল্লাহ্” পড়া।
৯.রুকুতে তিনবার ‘সুবহানা রব্বিয়াল আজিম' বলা।
১০.সিজদায় তিনবার ‘সুবহানা রব্বিয়াল আলা' বলা।
১১.শেষ বৈঠকে দুরুদ পড়া।
১২.শেষে সালাম ফিরানোর সময় উভয় দিকে তাকানো।
১৩. ইমামের জন্য জুমা ও ঈদের নামাজ ব্যতীত অন্য সকল নামাজের ক্ষেত্রে প্রথম রাকাতে,দ্বিতীয় রাকাতে যততুকু ক্বিরাত পড়বে তার দ্বিগুণ দীর্ঘ ক্বিরাত পড়া।
১৪ .রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় ইমাম ও একাকী আদায়কারী ব্যক্তির ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ' বলা।
১৫ রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ‘রব্বানা লাকাল হামদ' বলা৷ ১৬সিজদার সময় পায়ের আঙ্গুলগুলি বাঁকিয়ে অগ্রভাগকে কিবলামুখী
১৭রুকু থেকে সিজদায় যাওয়ার সময় এবং সিজদা থেকে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার' বলা।
১৮.সিজদায় হাত ও হাঁটু জমিনে রাখা।
১৯.দুই পায়ের গোড়ালির মাঝে দাঁড়ানো অবস্থায় চার আঙ্গুল পরিমাণ ফাঁকা রাখা। রুকুতে কাওমাতে ও সিজদাতে মিলিত রাখা।
২০ সূরা ফাতিহার পরে নিম্নস্বরে‘আমীন’ বলা,রুকুতে যাওয়ার সময় তাকবীর বলা রুকুতে হাতের আঙ্গুলগুলি খোলা অবস্থায় হাঁটুর উপর রেখে আঁকড়ে ধরা, সিজদার জন্য তাকবীর দেয়া বসার সময় বাম পা কে জমিনে বিছিয়ে ডান পাকে খাড়া করে রেখে বসা এবং দুই সিজদার মাঝে বসা।
মাগরিবের নামাজে সংক্ষিপ্ত সূরা পড়া হয়। ফজরের নামাজের প্রথম রাকাতে দ্বিতীয় রাকাতের তুলনায় দীর্ঘ ক্বিরাত পড়া উত্তম। জামাতের সাথে নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি সূরা ফাতিহা ও এর সাথে মিলিয়ে অন্য সূরা পরবে না। তবে ‘সুবহানাকা’ পড়বে। তাকবীরগুলিও বলবে। তাহিয়্যাত ও দুরুদ শরীফ পড়বে।
নামাজের মুস্তাহাবসমূহ
১. নামাজ আদায়ের সময়ে সিজদার স্থানে দৃষ্টি রাখা।
২ রুকুতে পায়ের দিকে দৃষ্টি রাখা।
৩.সিজদার সময় নাক যেখানে রাখে সেদিকে তাকানো।
৪. বসে তাহিয়্যাত পড়ার সময় হাঁটুর সামনের দিকে তাকানো।
৫.সূরা ফাতিহার পরে ফজরের সময় দীর্ঘ ক্বিরাত আর মাগরিবের সময় সংক্ষিপ্ত ক্বিরাত তিলাওয়াত করা।
৬. ইমামের অনুসরণকারী মুসল্লীর তাকবীরসমূহ নীচুস্বরে দেয়া।
৭. রুকুতে হাতের আঙ্গুলগুলি মেলে হাঁটুর উপরে রাখা। ৮ রুকুতে মাথা, ঘাড় ও পিঠ সমান রাখা ।
৯.সিজদায় যাওয়ার সময় প্রথমে ডান পরে বাম হাঁটু জমিনে রাখা ।
১০.সিজদার সময় মাথাকে দুই হাতের মাঝে রাখা।
১১.সিজদার সময় নাকের পরে কপাল রাখা।
১২ নামাজরত অবস্থায় হাই তুললে, হাতের তালুর বিপরীত পৃষ্ঠ দিয়ে মুখ
১৩.সিজদায় পুরুষগণের কনুই তুলে রাখা আর মহিলাদের কনুই জমিনে
১৪.সিজদায় পুরুষগণ হাত ও পা পেট থেকে আলাদা রাখবে।
১৫.রুকু এবং সিজদায় অন্ততপক্ষে তিনবার তাসবীহ পড়ার সময় পরিমাণ
অপেক্ষা করা ।
১৬.সিজদা থেকে মাথা উঠানোর পরে জমিন থেকে হাত তুলা।
১৭.হাত তুলার পরে হাঁটু তুলা।
১৮.তাহিয়্যাত পড়ার সময় হাতকে রানের উপর রেখে আঙ্গুলগুলি কিবলা বরাবর সোজা করে রাখবে। বাঁকাবে না এবং নাড়াচাড়াও করবে না।
১৯.ডানে বামে সালাম ফিরানোর সময় মাথাও উভয়দিকে ঘুরানো।
২০ সালাম ফিরানর সময় কাঁধের প্রান্তের দিকে তাকানো।
নামাজের মাকরুহসমূহ:
১. পোষাক পরিধান না করে কাঁধের উপর কাপড় রেখে নামাজ আদায় করা।
২. সিজদায় যাওয়ার সময় প্যান্ট বা পায়জামার নিম্নাংশ টেনে উপরে তুলা।
৩. পোষাকের হাতা বা পা বটে নামাজে দাঁড়ানো।
৪ নামাজের মধ্যে অর্থহীন অঙ্গভঙ্গি করা
৫.অতিরিক্ত পোশাক থাকা সত্ত্বেও কাজ করার ময়লা পোশাক পরে কিংবা এমন পোশাক যা পরে সম্মানিত মানুষের সামনে যাওয়া হয় না,তা পরিধান করে নামাজে দাঁড়ানো।
৬. মুখে এমন কিছু রাখা যার কারণে ক্বিরাত তিলাওয়াতে সমস্যা হয় না। আর এর কারণে ক্বিরাতে ব্যাঘাত ঘটলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যায়।
৭. মাথা খোলা রেখে নামাজ আদায় করা।
৮. টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার পরও না গিয়ে নামাজে দাঁড়ানো। পিছনের রাস্তা দিয়ে বায়ু নির্গমনের চাপ আসার পরও জোর করে নামাজ আদায় করাও একইভাবে মাকরুহ।
৯.নামাজরত অবস্থায় সিজদার স্থানের ধুলাবালি, পাথর ইত্যাদি সরানো৷
১০ নামাজরত অবস্থায় আঙ্গুল ফুটানো।
১১ নামাজরত অবস্থায় নিতম্বে হাত রাখা।
১২.মাথা কিংবা মুখমণ্ডল কিবলার থেকে অন্য দিকে ফিরানো, চোখ দিয়ে অন্য দিকে তাকানো। যদি বক্ষ কিবলা থেকে সরে যায় তবে নামাজ ভঙ্গ হয়। ১৩.তাশাহহুদের সময় কুকুরের মত বসা ।
১৪.সিজদার সময় পুরুষের হাত জমিনে বিছিয়ে রাখা। ।
১৫.মানুষের মুখোমুখি হয়ে নামাজ আদায় করা,কিংবা উল্টা ফিরে উচ্চস্বরে কথা বলছে এমন কারো পিছনে নামাজ আদায় করা।
১৬.নামাজরত অবস্থায় কেউ সালাম দিলে হাতের ইশারায় অথবা মাথা নেড়ে জবাব দেয়া।
১৭.নামাজের মাঝে হাই তুলা।
১৮ .নামাজে চোখ বন্ধ রাখা।
১৯.ইমামের সম্পূর্ণরূপে মিহরাবের মধ্যে দাঁড়ানো৷
২০.শুধুমাত্র ইমাম একাকী জামাত থেকে অর্ধমিটারের বেশী উঁচুতে অবস্থান
করলে।
২১.একাকী ইমামের জামাত থেকে নীচে অবস্থান করাও মাকরুহ।
২২ সামনের কাতারে খালি জায়গা থাকা অবস্থায় পিছনের কাতারে দাঁড়ানো। একইভাবে সামনের কাতারে খালি জায়গা না থাকার কারণে পিছনের কাতারে একাকী নামাজ আদায় করা।
২৩.নামাজ আদায়ের সময় মানুষ বা প্রাণীর ছবি সম্বলিত পোশাক পরিধান
২৪ .নামাজ আদায়কারী ব্যক্তির উপরে, সামনে ডানে ও বামে দেয়ালে অঙ্কিত অবস্থায় প্রাণীর ছবি থাকলে কিংবা ছবি সম্বলিত কাপড় বা কাগজ থাকলে নামাজ মাকরুহ হয়। রুশও প্রাণীর ছবির মত মাকরুহ।
২৫.জ্বলন্ত আগুনকে সামনে রেখে নামাজ আদায় করা।
২৬ নামাজরত অবস্থায় আয়াত তাসবীহ হাতের সাহায্যে গুনলে।
২৭.মাথা থেকে পা পর্যন্ত একটি মাত্র চাঁদর জড়িয়ে নামাজ আদায় করা।
২৮ মাথার উপরের অংশ উম্মুক্ত রেখে খালি মাথায় পাগড়ী পেঁচিয়ে নামাজ
আদায় করা।
২৯.নাক-মুখ ঢেকে নামাজ আদায় করা।
৩০, বিনা উজরে কাশি দেয়া,কফ বের করা।
৩১.এক দুইবার হাত নাড়াচাড়া করা।
৩২. নামাজের সুন্নাতসমূহ থেকে কোন একটি ত্যাগ করা।
৩৩.বিনা প্রয়োজনে বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ আদায় করা।
৩৪.মনোযোগ নষ্ট করে বা নামাজের খুশুর ক্ষতিসাধন করে এমন পরিবেশে কিংবা এমন বস্তুর পাশে নামাজ আদায় করা। যেমন সুসজ্জিত বা নকশা করা কোন বস্তুকে কিংবা সুস্বাদু বা প্রিয় খাবারকে সামনে রেখে নামাজ আদায় করা, খেলা চলছে কিংবা বাদ্য বাজছে এমন পরিবেশে নামাজ আদায় করা।
৩৫.ফরজ নামাজ আদায়ের সময় বিনা উজরে দেয়ালে কিংবা পিলারে ভর
৩৬রুকুতে যাওয়ার সময় কিংবা রুকু থেকে উঠার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠানো।
৩৭ রুকুতে যেতে যেতে কিরাত শেষ করা।
৩৮ রুকুতে বা সিজদায় ইমামের আগে যাওয়া বা উঠা।
৩৯.নাপাক হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন জায়গায় নামাজ আদায় করা।
৪০ কবরকে সামনে রেখে নামাজ আদায় করা।
৪১.তাশাহহুদ পড়ার সময় সুন্নাত অনুযায়ী না বসা।
৪২দ্বিতীয় রাকাতে প্রথম রাকাতের চেয়ে তিন আয়াত বেশী তিলাওয়াত
নামাজের বাইরের মাকরুহসমূহ
১.টয়লেটে কিংবা অন্য যে কোন স্থানে কিবলার দিকে কিংবা পিছন ফিরে প্রস্রাব, পায়খানা করা।
২. সরাসরি সূর্যের কিংবা চাঁদের আলোতে টয়লেট করা।
৩ নাবালক শিশুদেরকে কিবলামুখী করে টয়লেট করালে যে করাবে তার উপর মাকরুহ হবে। কেননা, বড়দের জন্য যা হারাম, ছোটদেরকে দিয়ে তা করানোও বড়দের উপর হারাম হয়।
৪. বিনা উজরে কিবলার দিকে পা প্রসারিত করা।
৫. পবিত্র কুরআন কিংবা অন্য কোন দ্বিনী কিতাবের দিকে পা প্রসারিত করা। তবে পা বরাবর না হয়ে উপরে থাকলে গুনাহ হয় না৷
নামাজ ভঙ্গকারী কারণসমূহ,
১.বিনা উজরে কাশি দেয়া অথবা গলা পরিষ্কার করা।
২. নামাজরত অবস্থায় অন্যের হাঁচির জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ” বলা
৩.একাকী নামাজ আদায়কারী ব্যক্তি, পাশে জামাতের সাথে নামাজ আদায়কারী ইমামের ভুল হচ্ছে বুঝতে পেরে তাকে শুধরে দিলে নিজের নামাজ নষ্ট হয়। যদি ইমাম এই ব্যক্তির কথা অনুযায়ী আদায় করে,তবে ইমামের নামাজও ভঙ্গ হবে।
৪. কোন কিছুর জবাব দেয়ার উদ্দেশ্যে নামাজরত অবস্থায় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বললে নামাজ ভঙ্গ হবে। তবে যদি তা অবগত করার উদ্দেশ্যে বলে তবে নামাজ ভঙ্গ হবে না।
৫. সতর তথা লজ্জাস্থান উম্মুক্ত হলে।
৬. ব্যাথা কিংবা দুনিয়াবী কোন কারণে কান্না করলে। তবে জান্নাত কিংবা জাহান্নামের কথা স্মরণ করে সেখানকার অবস্থার কথা ভেবে কান্না করলে নামাজ ভঙ্গ হবে না।
৭. মুখে কিংবা হাতের ইশারায় সালামের জওয়াব দিলে।
৮. পাঁচ ওয়াক্তের কম নামাজ ক্বাজা হলে এবং তা নামাজরত অবস্থায় স্মরণে আসলে।
৯ নামাজের মধ্যে এমন কোন আচরণ বা কাজ করা যা কেউ দেখলে,বুঝবে যে সে নামাজ আদায় করছে না৷
১০ নামাজরত অবস্থায় কোন কিছু খেলে কিংবা পানি পান করলে।
১১ নামাজরত অবস্থায় কথা বললে৷
১২ইমাম ব্যতীত অন্য কারো ভুল ধরলে
১৩ নামাজরত অবস্থায় হাসলে।
১৪নামাজের মধ্যে আওয়াজ করে কাঁদলে কিংবা হাহুতাশ করলো।
যে সব অবস্থায় নামাজ ভঙ্গ করা মুবাহ:
১. সাপ মারার জন্য।
২. পলায়নরত পশু ধরার জন্য।
৩. পশুপালকে হিংস্র প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।
৪. জ্বলন্ত চুলায় থাকা পাতিল থেকে পানি বা খাবার উথলে পড়ার উপক্রম হলে তা নিবারণের জন্য।
৫.ওয়াক্ত বা জামাত হারানোর আশঙ্কা না থাকলে,অন্য মাজহাবে যেসব কারণে নামাজ ভঙ্গ হয় সেসব কারণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নামাজ ভঙ্গ করা জায়েজ। যেমন, এক দিরহামের চেয়ে কম পরিমাণ নাজাসাত থেকে পবিত্ৰ হওয়ার জন্য কিংবা পরনারীর স্পর্শ লেগেছে এ কথা স্মরণে আসলে,অজু করার জন্য নামাজ ভঙ্গ করা জায়েজ।
৬. প্রস্রাব পায়খানা বা বায়ু নির্গমনের চাপ অনুভব করলে তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নামাজ ভঙ্গ করা জায়েজ।
যে সব অবস্থায় নামাজ ভঙ্গ করা ফরজ:
১.‘বাঁচাও” বলে কেউ চিৎকার করলে তাকে বাঁচানোর জন্য কিংবা কুয়ায় পড়ার আশঙ্কা আছে এমন অন্ধ কাউকে রক্ষার জন্য অথবা আগুনে পুড়তেছে পানিতে ডুবে যাচ্ছে এমন কাউকে উদ্ধারের জন্য,আগুন নিভানোর জন্য নামাজ ভঙ্গ করা ফরজ।
২.মা-বাবা,দাদা-দাদী,নানা-নানী ডাকলে ফরজ নামাজ ভঙ্গ করা ওয়াজিব হয় না,তবে ভঙ্গ করা জায়েজ,প্রয়োজন না হলে ভঙ্গ না করা উত্তম। সুন্নাত সহ সকল নফল নামাজ ভঙ্গ করতে হয়। আর তারা যদি সাহায্যের জন্য ডেকে থাকে তবে নামাজ ভঙ্গ করা আবশ্যক হয়৷
জামাতে নামাজ:
নূন্যতম দুইজনের মধ্য থেকে একজনের ইমাম হয়ে একত্রে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফরজসমূহ জামাতের সাথে আদায় করা পুরুষদের জন্য সুন্নাত। জুমা ও ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে জামাতে আদায় করা ফরজ। বহু হাদীস শরীফের মাধ্যমে আমাদেরকে অবগত করা হয়েছে যে,জামাতের সাথে আদায়কৃত নামাজের জন্য প্রচুর সওয়াব রয়েছে। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে,“জামাতের সাথে আদায়কৃত নামাজের জন্য, একাকী আদায়কৃত নামাজের থেকে সাতাশ গুণ বেশি সওয়াব প্রদান করা হয়”। তিনি (সঃ) আরো বলেছেন যে, “ভালোভাবে অজু করে জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য যখন কেউ কোন মসজিদে গমন করে,তখন তার প্রতি কদমের জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা একটি করে সওয়াব প্রদান করেন এবং তার আমল দফতর থেকে একটি করে গুনাহ মুছে দেন এবং জান্নাতে তার মর্যাদা একধাপ বাড়িয়ে দেন” ।
জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে ঐক্য প্ৰতিষ্ঠা হয়। সম্প্রীতি ও বন্ধন সুদৃঢ় হয়। জামাতে একত্রিত হয়ে মুসলমানগণ পরস্পরের সাথে কূশলাদি বিনিময় করেন। এর দ্বারা কারো কোন সমস্যা থাকলে কিংবা কেউ অসুস্থ হলে তা প্রকাশ পায় অন্যদের পক্ষে তার সাহায্যে এগিয়ে আসা কিংবা তার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করা সহজ হয়। সমস্ত মুসলমানগণ যে এক ক্বালব ও এক শরীর তার সর্বোত্তম উদাহরণ হলো এই জামাতের সাথে আদায়কৃত নামাজ।
অসুস্থ পক্ষাঘাতগ্রস্থ খোঁড়া, হাঁটতে অক্ষম বৃদ্ধ ও অন্ধের জন্য জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা আবশ্যক নয়।
জামাতের সাথে নামাজ আদায়ের সময় যাকে অনুসরণ করা হয় তাকে ইমাম বলা হয়। ইমাম হওয়ার জন্য এবং তার অনুসরণ করে জামাত হওয়ার জন্য কতিপয় শর্ত রয়েছে।
